রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর ২৮টি সড়কে নেতা-কর্মীরা ঝগড়া ছাড়াই ভাগ করে ময়লা–বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও তাদের দেখানো পথই অনুসরণ করে এখন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা এই ব্যবসা বহাল রেখেছেন।

ঢাকা উত্তর সিটির ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের আওতায় বনানী। এখানে মূলত ২৮টি সড়ক রয়েছে। আওয়ামী লীগের (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) স্থানীয় কিছু নেতা-কর্মী এগুলোকে ৭টি ভাগে ভাগ করেছিলেন। ঝগড়া-মারামারি এড়াতে সমঝোতায় সড়কগুলো নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই একই পথ ধরে বিএনপির স্থানীয় কিছু নেতা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে (২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়) ২৮টি সড়ককে ১২টি ভাগে ভাগ করেছেন। এতে কোন সড়কের পাশের বাসাবাড়ি থেকে কারা ময়লা সংগ্রহ করবে, তা ঠিক হয়েছে।

স্থানীয় প্রভাব, ক্ষমতা ও জনবলের ভিত্তিতে বনানী থানা বিএনপি, ওয়ার্ড বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দল, কৃষক দল, মহিলা দল ও মৎস্যজীবী দলের কিছু নেতার মধ্যে ময়লা–বাণিজ্য ভাগ হয়েছে। কারও অধীনে একটি, কারও দুটি বা তিনটি সড়ক। বনানীর কোন সড়ক কার নিয়ন্ত্রণে, তা জানতে বিএনপির স্থানীয় নেতা–কর্মী, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ভ্যান সার্ভিসের কর্মীসহ ২৮ জনের সঙ্গে চলতি মে মাসের প্রথম সপ্তাহে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ।

বনানীতে ফ্ল্যাটপ্রতি ময়লার বিল অন্য এলাকার তুলনায় বেশি আদায় করা যায়। সিটি করপোরেশন ১০০ টাকা নির্ধারণ করলেও এখানে ৩০০ টাকার কম নেওয়া হয় না। হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে কমপক্ষে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা।

আওয়ামী লীগের (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) স্থানীয় কিছু নেতা-কর্মী বনানীর ২৮টি সড়ককে ৭টি ভাগে ভাগ করেছিলেন। মূলত নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-মারামারি এড়াতে কোন সড়ক কোন সংগঠনের নেতা-কর্মীদের অধীনে থাকবে, সেটি সমঝোতার মাধ্যমে ঠিক হয়েছিল তখন। সেই পথ অনুসরণ করে বিএনপির স্থানীয় কিছু নেতা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে (২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়) বনানীর ২৮টি সড়ককে ১২টি ভাগে ভাগ করেছেন।

বনানী থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি রেজাউল করিমের অনুসারীরা সবচেয়ে বেশি ১০টি সড়কের ময়লা সংগ্রহ করেন। সড়কগুলো বনানী ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ১১, ১৬, ২৬ ও ২৮ নম্বর। তাঁর সঙ্গে আছেন সাধারণ সম্পাদক চান মিয়া।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাদের নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের কাজ বন্ধ হয়। তখন ১৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য মোহাম্মদ লুৎফর, থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সোলায়মানসহ কয়েকজন নিয়ন্ত্রণ নেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে রেজাউল করিমের নেতৃত্বে পুরো এলাকার ময়লা–বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। তিনি ১০টি সড়ক নিজের কাছে রাখেন, বাকি ১৮টি অন্য নেতাদের মধ্যে ভাগ করেন।

রেজাউল করিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ১০টি সড়কের ময়লা সংগ্রহ ও বিল তোলার কাজ তাঁর একক নিয়ন্ত্রণে নয়। বনানী থানা, ওয়ার্ড বিএনপিসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতা–কর্মীরা যুক্ত। সবাই মিলে কাজ চলে এবং মাস শেষে আয় ভাগ হয়।

রেজাউল করিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “একসময় আমাদের সাবেক কাউন্সিলর নকী (আবদুল আলীম নকী) ভাই এটা কন্ট্রোল করেছেন। পরবর্তী সময়ে যখন সংগঠনের ছেলেরা একসঙ্গে হয়েছে, তখন এই ২৮টা রোড বিভিন্ন সংগঠনকে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্ন রোডে সার্ভিস দেয়।”

তাঁর পর থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাসিবুল ইসলাম (মিম) তিনটি সড়ক (৭, ৮ ও ৯) নিয়ন্ত্রণ করেন। বনানী ইউনিট বিএনপির সভাপতি আলী আহম্মেদ বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এই সড়কগুলো মো. লুৎফর ও সোলায়মান করতেন। কিন্তু ডিসেম্বরে অন্যরা নিয়ে নেন, মিম পান ৭, ৮ ও ৯।

একসময় আমাদের সাবেক কাউন্সিলর নকী (আবদুল আলীম নকী) ভাই এটা কন্ট্রোল করেছেন। পরবর্তী সময়ে যখন সংগঠনের ছেলেরা একসঙ্গে হয়েছে, তখন এই ২৮টা রোড বিভিন্ন সংগঠনকে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্ন রোডে সার্ভিস দেয়।
বনানী থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি রেজাউল করিম

ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবদুল মোমিনের অধীনে ২৫ ও ২৭ নম্বর সড়ক। থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. খোকনের ২২ ও ২৪। আলী আহম্মেদের ১৪ ও ২৩ নম্বর।

বনানী ইউনিট বিএনপির সভাপতি আলী আহম্মেদের দায়িত্ব হচ্ছে ১৪ ও ২৩ নম্বর সড়ক এলাকার বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহ ও বিল তোলা।

আবদুল মোমিন বলেন, সড়ক ভাগ থাকলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেজাউল করিমের কাছে। ৫ আগস্টের পর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউর উত্তর অংশের সড়কগুলোও তাঁর কর্মীরা নিয়ন্ত্রণ করছেন।

থানা শ্রমিক দলের সভাপতি হারুনুর রশিদের ১০ ও ১৫ নম্বর সড়ক। থানা মৎস্যজীবী দলের সাধারণ সম্পাদক সানাউল্লাহ সানোয়ারের ২০ ও ২১। মহাখালীর তিতুমীর কলেজ ছাত্রদলের দুজন নেতার ১৭ ও ১৯। থানা কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. সামাদের ১৮, থানা মহিলা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক বিউটি বেগমের ১২, থানা ছাত্রদলের সভাপতি নাঈম উদ্দিন মেজবাহর ১৩ নম্বর সড়ক।

রেজাউল করিম বলেন, “থানার বিএনপিসহ বিভিন্ন সংগঠন, যেমন ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল, শ্রমিক দল, মৎস্যজীবী দল, মহিলা দল—এ রকম বিভিন্ন দলের (নেতা–কর্মীকে) বিভিন্ন রোড দিয়ে দিছে যে তোমরা এটা মেইনটেইন করো। এটার কোনো একক নিয়ন্ত্রণ কারও কাছে নেই।”

একটি হোল্ডিংয়ে গড়ে ছয়টি করে ফ্ল্যাট ধরলে বনানীতে প্রায় ৪৮ হাজার ফ্ল্যাট আছে। প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে নেওয়া হয় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে গড়ে ৩০০ টাকা করে বিল নিলে ময়লা–বাণিজ্য থেকে মাসে আদায় হয় ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।

ঢাকা উত্তর সিটির রাজস্ব বিভাগের হিসাবে, ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে ২২ হাজার ৫৪১টি হোল্ডিং। বনানীতে প্রায় আট হাজার। এক হোল্ডিংয়ে গড়ে ছয় ফ্ল্যাট ধরলে ৪৮ হাজার ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাটপ্রতি গড়ে ৩০০ টাকা হলে মাসে ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।

বনানীতে ছোট-বড় ১৫০টি হোটেল-রেস্তোরাঁ। এগুলো থেকে তিন থেকে পাঁচ হাজার, বড়দের থেকে ৮–১০ হাজার টাকা। গড়ে চার হাজার হলে ছয় লাখ। সব মিলিয়ে মাসে দেড় কোটি টাকা আয়।

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, ময়লার বিল নিয়ে হোটেলমালিকরা ক্ষোভ জানালেও প্রকাশ্যে বলেন না। ময়লা বন্ধ হলেই বিপদ। সিটি করপোরেশনের উচিত শৃঙ্খলা আনা।