চট্টগ্রাম নগরের কাঠগড় জেলেপাড়ার সুমন জলদাস (৪০) পাঁচ মাসের মেয়ে জয়া দাসকে নিয়ে ২০ দিন ধরে হাসপাতালের দৌড়। গত ২০ এপ্রিল জয়ার শরীরে জ্বর ও ফুসকুড়ি দেখা দেয়। স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে প্রথমে তাকে একটি দাতব্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে সেখানে ১৫ হাজার টাকা পরিশোধ করে আইসিইউ খোঁজেন স্বজনেরা। সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বেড না পেয়ে ৩০ এপ্রিল জিইসি এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি হয় জয়া। দীর্ঘ চিকিৎসার পর এখন সে কিছুটা সুস্থ। কিন্তু অর্থাভাবে মেয়েকে ঘরে ফেরাতে পারছেন না সুমন।

‘আমার মেয়ের হাম হয়েছে। চিকিৎসকেরা বলেছিলেন তাকে আইসিইউতে ভর্তি করাতে হবে। সরকারি হাসপাতালে অনেক ঘুরেছি, কিন্তু কোথাও আইসিইউ বেড খালি পাইনি। বাধ্য হয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করাই। এখন মেয়ে সুস্থ আছে, কিন্তু হাসপাতালের বিল অনেক বেশি এসেছে। স্ত্রীর সব গয়না বিক্রি করেও পুরো বিল হচ্ছে না। আমরা গরিব মানুষ, ৮০ হাজার টাকা দিয়েছি। তবু হাসপাতাল থেকে মেয়েকে ছাড়ছে না।’

‘সরকারি হাসপাতালে অনেক ঘুরেছি, কিন্তু কোথাও আইসিইউ বেড খালি পাইনি। বাধ্য হয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করাই। এখন মেয়ে সুস্থ আছে, কিন্তু হাসপাতালের বিল অনেক বেশি এসেছে। স্ত্রীর সব গয়না বিক্রি করেও পুরো বিল হচ্ছে না। আমরা গরিব মানুষ, ৮০ হাজার টাকা দিয়েছি। তবু হাসপাতাল থেকে মেয়েকে ছাড়ছে না।’ সুমন জলদাস, হামে আক্রান্ত শিশুর বাবা।

গত মঙ্গলবার থেকে তিন দফায় কথা হয়েছে সুমনের সঙ্গে। তিনি জানান, চিকিৎসার খরচ জোগাতে সঞ্চয় শেষ করেছেন, স্ত্রীর গয়না বিক্রি করেছেন এবং স্বজনদের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। এসব মিলে ৮০ হাজার টাকা জোগাড় করলেও হাসপাতালের মোট বিল ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। বাকি টাকা দেওয়া না গেলে মেয়েকে ছাড়ছে না হাসপাতাল।

মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন সুমন। পরপর চার ছেলের পর মেয়ে হওয়ায় পরিবার সবাই খুশি ছিল। বড় ছেলের বয়স ১৭ বছর, টাকার অভাবে তার পড়াশোনা করাতে পারেননি। মেজো ছেলেও শ্রমিকের কাজ করে। এখন অনটনের সংসারে মেয়েকে ফেরানোর টাকা জোগাড়ে দিশাহারা সুমন।

সুমনের শ্যালক হৃদয় দাস বলেন, ‘শুরুতে ভেবেছিলাম ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সোমবার জয়া সুস্থ হওয়ার পর হাসপাতাল ২ লাখ ২৯ হাজার টাকার বিল দেয়। এখন পর্যন্ত ৮০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। আরও ৩০ হাজার টাকা জোগাড়ের কথা বলেছি। কিন্তু তারা ২ লাখ টাকার নিচে কিছুতেই রাজি হচ্ছে না।’

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছেন, মুমূর্ষু অবস্থায় শিশুটিকে ভর্তি করা হয়েছিল। নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় আইসিইউতে রাখা হয় এবং হাই ফ্লো অক্সিজেনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। সেই ব্যয়ের ভিত্তিতে বিল তৈরি। তবে মানবিকতার খাতিরে চিকিৎসক ফি ও সার্ভিস চার্জ মওকুফ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, মানবিক বিবেচনায় চিকিৎসক ফি ও সার্ভিস চার্জ মওকুফ করা হয়েছে। তবে অক্সিজেন ও ওষুধের খরচ বাবদ ন্যূনতম একটি বিল পরিশোধ করতে হবে। আমরা পরিবারটির প্রতি সহানুভূতিশীল। আর্থিক চাপ কমিয়ে সমাধানের চেষ্টা চলছে।

আজ বৃহস্পতিবার আরেক দফা কথা হয় সুমনের সঙ্গে। তিনি তখন মেয়েকে হাসপাতালে রেখে অন্য হাসপাতালে ছুটেছেন। জানালেন, জয়ার জন্মকালীন সিজারে স্ত্রী রীতা দাসের জটিলতা দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার রাতে তাকে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সুমন বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম চিকিৎসা শেষ হলে মেয়েকে নিয়ে বাসায় ফিরতে পারব। কিন্তু এখন সুস্থ হওয়া সত্ত্বেও হাসপাতালের বিলই আমাদের সবচেয়ে বড় বাধা। এখন মেয়ে সুস্থ, কিন্তু টাকার অভাবে তাকে বাসায় নিতে পারছি না। এই অবস্থায় আমার স্ত্রীও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। একসঙ্গে দুজনকে নিয়ে হাসপাতাল আর বিলের চিন্তায় আমরা দিশাহারা হয়ে পড়েছি।’