আমার এক কাজিন ঘরের আয়নাটা ঢেকে রেখেছে। বাথরুমে গিয়ে দেখি, সেখানকার বেসিনের আয়নাও একটা ওড়না দিয়ে ঢাকা। জিজ্ঞেস করতেই সে বলল, নিজের চেহারা দেখতে ইচ্ছা করে না। নিজের শরীর বা চেহারা নিয়ে ভেতরে জন্মানো অসন্তোষ, শরীর দেখতে না পারা বা ঘৃণা করা—এটাকেই মনোবিজ্ঞানে বলে ‘বডি ডিজমরফিয়া’ বা ‘বডি ডিজমরফিক ডিজঅর্ডার’ (বিডিডি)।
আয়নায় তাকালে মনে হয় নাকটা ঠিক নেই, ত্বকের অবস্থা খারাপ, শরীর ভারী বা অস্বাভাবিক। মনে হয় সবাই এই ত্রুটিগুলো দেখছে। কিন্তু আশপাশের লোকেরা হয়তো কিছুই খেয়াল করছে না।
এই ধরনের ‘ইনসিকিউরিটি’ যখন ভয় ও ঘৃণায় পরিণত হয়, তখন তাকে বডি ডিজমরফিয়া বা বিডিডি বলে। এতে ব্যক্তি নিজের চেহারা বা শরীর নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগে, যা স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করে। এখানে ছোট বা অদৃশ্য ত্রুটিকে তারা বড় সমস্যা মনে করে।
সম্প্রতি অনেক সেলিব্রিটি গণমাধ্যমে তাঁদের বিডিডির অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন, যা সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করছে।
নিজের চেহারা ও শরীর নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা এত তীব্র হলে—
- আত্মবিশ্বাস কমে যায়
- সামাজিক জীবন ব্যাহত হয়
- কাজ বা পড়াশোনায় প্রভাব পড়ে
- আয়না, ছবি বা অন্যের মন্তব্য নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়
- চেহারা বা শরীর দেখতে চায় না, বা খুঁটিয়ে দেখতে থাকে এবং ত্রুটি নিয়ে ভাবে
- অন্যের মতামতের চিন্তায় সামাজিক জীবন থেকে দূরে থাকে
১. চেহারা বা শরীর নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা
দিনের অনেক সময় কাটে নিজের চেহারা ভেবে, অন্যের সঙ্গে তুলনা করে, ছোট খুঁত বড় করে দেখে এবং লুকানোর উপায় খুঁজে।
২. বারবার আয়না দেখা বা এড়িয়ে চলা
কেউ বারবার আয়না দেখে, কেউ এড়িয়ে যায় কারণ দেখলে অস্বস্তি হয়।
৩. ছবি তুলতে অস্বস্তি
ক্যামেরা এড়িয়ে চলে, ছবি এডিট করে এবং নিজের ছবিতে শুধু ত্রুটি দেখে।
৪. সামাজিক অস্বস্তি
মনে হয় সবাই তাকাচ্ছে, বিচার করছে বা চেহারা নিয়ে ভাবছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দেয়।
ইনস্টাগ্রাম, টিকটক বা ফিল্টার্ড ছবি অবাস্তব সৌন্দর্যের মানদণ্ড তৈরি করে। তুলনায় নিজের স্বাভাবিক চেহারাকে ত্রুটিপূর্ণ মনে হয়।
সঠিক কারণ জানা না গেলেও কিছু বিষয় ভূমিকা রাখে:
- ভুল প্যারেন্টিং, স্কুলে বুলিং বা ট্রমা থেকে হীনম্মন্যতা
- আত্মসম্মান কম বা ব্যক্তিত্বের অসম্পূর্ণ বিকাশ
- টক্সিক পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ
- নিজেকে গ্রহণ করতে না পারা
- শিক্ষাঙ্গন বা কর্মক্ষেত্রে বডি শেমিং
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পারফেকশনিজম, চেহারাকে সবকিছু মেনে নেওয়া
- উদ্বিগ্নতা, হতাশা বা অবসেসিভ চিন্তার প্রবণতা
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কমপারিজন কালচার
চেহারা নিয়ে চিন্তা যদি দৈনন্দিন জীবন নষ্ট করে, সম্পর্ক-কাজে সমস্যা হয়, বাইরে যেতে ভয় লাগে, অতিরিক্ত কসমেটিক ব্যবহার হয় বা ঘৃণা-হতাশা হয়—তাহলে মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।
১. নিজের চিন্তাকে ‘সত্য’ ভাববেন না
মনে হওয়া সব চিন্তা সত্য নয়। বিডিডিতে মস্তিষ্ক ত্রুটিকে বাস্তবের চেয়ে বড় করে দেখে।
২. তুলনা বন্ধ করুন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যকে দেখে নিজেকে বিচার বন্ধ করুন। দেখা সব সত্য নয়, এবং সত্য হলেও আপনি আপনার মতো।
৩. আপনি কেবল চেহারা বা শরীর নন
চেহারা ছাড়া দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব, সম্পর্ক, মূল্যবোধ দিয়ে পরিচয় তৈরি করুন। এগুলোই সত্যিকারের ‘আপনি’।
৪. নিজেকে তেমনভাবেই গ্রহণ করুন
সুন্দর-অসুন্দরের ধারণা সমাজের তৈরি। নিজেকে গ্রহণ করাই সুন্দর এবং আত্মবিশ্বাসী করে।
৫. বিশ্বস্তের সঙ্গে কথা বলুন, প্রয়োজনে পেশাদার সাহায্য নিন
অনুভূতি শেয়ার করুন। সিবিটি থেরাপি কার্যকর, কিছু ক্ষেত্রে ওষুধও লাগতে পারে।
মনে রাখবেন, আপনি চেহারা-শরীরের চেয়ে অনেক বেশি।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে ও ভোগ






