সালমান খানের সঙ্গে অভিষেকের স্বপ্নিল শুরু, ঘনিষ্ঠ দৃশ্য নিয়ে বিতর্ক—কিন্তু কোথায় হারিয়ে গেলেন জারিন খান? একসময় তাঁকে বলা হতো ‘নতুন ক্যাটরিনা’। বিশাল বাজেটের সিনেমায় অভিনয়ের প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। কিন্তু সেই আলো দ্রুতই ম্লান হয়ে যায়। আজ ১৪ মে জারিন খানের জন্মদিন। এই দিনে তাঁর উত্থান-পতন, সংগ্রাম ও নতুন চেষ্টার গল্প তুলে ধরা যাক।

সাধারণ পরিবারের মেয়ে
১৯৮৭ সালের ১৪ মে মুম্বাইয়ের এক পাঠান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জারিন খান। ছোটবেলায় বিলাসিতা ছিল না, বরং আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। জারিন বহু সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তাঁর বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মা-ই ছিলেন তাঁদের ভরসা। মা ও ছোট বোনকে নিয়ে কঠোর সময় কাটিয়েছেন তিনি।

চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন জারিন। পড়াশোনায়ও ছিলেন ভালো। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সমস্যায় সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। অল্প বয়সেই কাজ শুরু করেন—কখনো কল সেন্টারে, কখনো ছোটখাটো মডেলিং, এমনকি ওজন নিয়ে কটূক্তিও সহ্য করেছেন। একসময় তাঁর ওজন ছিল প্রায় ১০০ কেজির কাছাকাছি। তখন কেউ ভাবেনি এই মেয়ে বলিউড নায়িকা হবেন। কিন্তু ভাগ্য অদ্ভুতভাবে পথ খুলে দেয়।

সালমানের চোখে পড়া
জারিনের বলিউড প্রবেশ নাটকীয়। এক অনুষ্ঠানে তাঁকে প্রথম দেখেন সালমান খান ‘বীর’ সিনেমার জন্য নতুন মুখ খুঁজতে গিয়ে। তাঁর মুখাবয়বে পান ক্যাটরিনা কাইফের ছায়া। তখন ক্যাটরিনা সালমানের ঘনিষ্ঠ এবং জনপ্রিয় নায়িকা। ফলে জারিনকে ‘ক্যাটরিনার ডুপ্লিকেট’ বলে তুলনা শুরু হয়, যা পরে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়।

২০১০ সালে মুক্তি পায় ‘বীর’। ঐতিহাসিক ছবিতে রাজকন্যার ভূমিকায় অভিনয় করেন জারিন, বিপরীতে সালমান খান। বিশাল বাজেট ও প্রচার সত্ত্বেও বক্স অফিসে ছবি প্রত্যাশা পূরণ করেনি। তবু নতুন অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর সৌন্দর্য ও স্ক্রিন উপস্থিতি নজর কাড়ে। কিন্তু অভিনয় নিয়ে সমালোচনাও তীব্র হয় এবং ক্যাটরিনার তুলনা নিজস্ব পরিচয় গড়তে বাধা দেয়।

‘হাউসফুল ২’ ও জনপ্রিয়তা
‘বীর’ ব্যর্থতার পর অনেকে মনে করেন জারিন হারিয়ে যাবেন। কিন্তু ২০১২ সালে ‘হাউসফুল ২’ তাঁকে আবার আলোচনায় ফিরিয়ে আনে। মাল্টিস্টারার কমেডিতে হালকা গ্ল্যামারাস ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। ছবি বক্স অফিসে হিট হয়, জারিন জনপ্রিয়তা পান। তবে অভিনয়ের চেয়ে সৌন্দর্যই বেশি আলোচিত হয়, যা বলিউডে তাঁর বড় সমস্যা হয়ে ওঠে।

আইটেম গান ও গ্ল্যামারের ফাঁদ
টিকে থাকতে গ্ল্যামারনির্ভর চরিত্র করেন জারিন। ‘রেডি’র ‘ক্যারেক্টার ঢিলা’ গানে তাঁর উপস্থিতি ব্যাপক আলোচিত হয়। এরপর নির্মাতারা তাঁকে গ্ল্যামারাস চরিত্রের জন্যই দেখেন, শক্তিশালী ভূমিকার প্রস্তাব কম আসে। জারিন বলেছেন, মানুষ তাঁর অভিনয়ের চেয়ে শরীর বা চেহারা নিয়ে বেশি কথা বলেছে, যা মানসিকভাবে কঠিন।

‘হেট স্টোরি ৩’ ও সাহসী দৃশ্যের বিতর্ক
২০১৫ সালে ‘হেট স্টোরি ৩’ মুক্তি পায়। ছবিতে জারিনের অন্তরঙ্গ দৃশ্য তুমুল আলোচনা সৃষ্টি করে। পরে তিনি বলেছেন, এই দৃশ্যগুলোতে ভীষণ অস্বস্তি বোধ করতেন, কারণ ব্যক্তিগতভাবে রক্ষণশীল। ক্যারিয়ারের চাপে করতে হয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, পরিবারের সঙ্গে নিজের সিনেমা দেখতে পারতেন না, আত্মীয়দের প্রতিক্রিয়ায় বিব্রত হতেন। এই ইমেজ দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি করেছে, দর্শক তাঁকে সিরিয়াস অভিনেত্রী মানেনি।

কেন হারিয়ে গেলেন?
জাঁকজমকপূর্ণ অভিষেক সত্ত্বেও জারিন কেন হারিয়ে গেলেন? বলিউডে শুধু সৌন্দর্য যথেষ্ট নয়, দরকার শক্তিশালী চরিত্র, ভালো পরিচালক ও ধারাবাহিক সাফল্য—যা তিনি কম পান। ক্যাটরিনার তুলনা আলাদা পরিচয় গড়তে বাধা দেয়। প্রতিযোগিতা ছিল তীব্র—দীপিকা পাড়ুকোন, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, আনুশকা শর্মা, সোনাক্ষী সিনহা সবাই জায়গা করে নেন। সালমানের মতো ‘গডফাদার’ সবাইকে টিকিয়ে রাখতে পারে না, দর্শকের গ্রহণযোগ্যতাই আসল।

সুন্দরী বলে ছবি থেকে বাদ পড়েছিলেন
২০২১ সালে ‘হাম ভি অ্যাকেলে তুম ভি অ্যাকেলে’তে অভিনয় প্রশংসিত হয়। সাক্ষাৎকারে জারিন বলেন, ‘আমার অভিনয়ের প্রশংসা হচ্ছে, খুবই খুশির কথা। কিন্তু এত দেরিতে আমি নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ পেলাম। অবশেষে আমি নিজের অভিনয়দক্ষতাকে মেলে ধরতে পারলাম। ব্যতিক্রমী এবং সাহসী এক চরিত্রের মাধ্যমে নিজেকে ভালো অভিনয়শিল্পী প্রমাণ করলাম। এখানে শুধু মেকআপ চড়িয়ে নাচ-গান করিনি। আশা করি, এই ছবির পর আমার সম্পর্কে মানুষের ধারণা কিছুটা বদলাবে। আমাকে অন্য চোখে দেখবে তারা। আমার সম্পর্কে অনেকের ধারণা, আমি শুধু সুন্দর। আমি অভিনয় জানি না। এই ধারণাটা এবার ভাঙবে।’ তাঁর সৌন্দর্য ক্যারিয়ারে বাধা হয়েছে, এমনকি বেশি সুন্দর বলে ছবি থেকে বাদ পড়েছেন। বলেন, ‘ক্যারিয়ারের শুরু থেকে প্রত্যাখ্যানকে মাথা পেতে নিয়েছি। তাই এসব এখন গা–সওয়া হয়ে গেছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, আমি বেশি সুন্দর, এই অজুহাতে আমাকে সিনেমা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আমি নাকি কোনো সিরিয়াস ধরনের চরিত্রের সঙ্গে মানানসই নই।’

শরীর নিয়ে ট্রল ও মানসিক চাপ
জারিন শরীর নিয়ে ট্রলের শিকার। কখনো মোটা বলা হয়, ওজন কমলে আবার অন্য কথা। সোশ্যাল মিডিয়ায় এতে প্রভাবিত হন। পরে বোঝেন, এসব পেছনে ছুটলে জীবন নষ্ট হয়। ‘বডি শেমিং’-এ বলেন, ‘ফিল্মে ক্যারিয়ারের শুরু থেকে আমি বডি শেমিংয়ের শিকার। “বীর” মুক্তির পর অনেকে বলেছিল আমি অনেক মোটা। তখন কেউ শরীর নিয়ে কিছু বললে খারাপ লাগত। ক্যারিয়ার শুরুর আগে আমার ওজন ছিল ১০০ কেজি। ৫০ কেজি ঝরানোর পরও আমাকে শুনতে হয়েছে, আমি মোটা। তবে এখন আর এসব খারাপ লাগে না। আমি বলতে চাই, একজন অভিনেত্রীকে তাঁর অভিনয়ক্ষমতা দিয়ে বিচার করা উচিত। তাঁর ওজন, উচ্চতা, বর্ণ—এসব দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে এসবই দেখা হয়। ইন্ডাস্ট্রির বড় বড় মানুষেরা বডি শেমিং নিয়ে নানা কথা বলেন। কিন্তু তাঁরাই তাঁদের ছবিতে রোগা-পাতলা নায়িকা নেন। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে দেখনদারি আর দ্বিচারিতা অনেক বেশি।’

অন্তরঙ্গ দৃশ্যে অভিনেত্রীদের লক্ষ্যবস্তু করা
সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে জারিন বলেন, অন্তরঙ্গ দৃশ্যে নায়িকাদের প্রশ্ন তোলা হয়, নায়কদের তারিফ। ‘একই দৃশ্য যখন কোনো নায়ক করেন, তখন তাঁকে “কুল” বলা হয়। কিন্তু কোনো নায়িকা সেই দৃশ্য করলে সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাঁকে বলা হয় “সহজলভ্য”।’ দর্শক ভাবে পর্দার দৃশ্য বাস্তবে তেমন, যা ভুল। সাহসী দৃশ্যের পর নারীরা আজগুবি প্রশ্ন ও প্রস্তাবের মুখোমুখি হন।

দক্ষিণি সিনেমা ও অন্য ভাষার কাজ
বলিউডে সুযোগ কমলে পাঞ্জাবি ও দক্ষিণি সিনেমায় কাজ করেছেন জারিন। বড় তারকা না হলেও অভিনয়ের ভালোবাসায় চালিয়ে যান।

ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে গুঞ্জন
বলিউডে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে গুঞ্জন হয়েছে জারিনের। অভিনেতা ও টিভি ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সম্পর্কের গসিপ উঠেছে। তবে তিনি কাজ ও পরিবার নিয়েই বেশি কথা বলেন।

নতুন সময়ে নতুন জারিন
সাম্প্রতিক বছরে সিনেমায় কম দেখা গেলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় জারিন। সাক্ষাৎকারে আত্মবিশ্বাসী ও খোলামেলা। নতুন প্রজন্মকে বলেন, নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা না করতে।

বলিউড হাঙ্গামা, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও বলিউড লাইফ অবলম্বনে