দেশে হাম একটি বড় উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। গত দুই মাসে এই রোগ ও এর উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে, মৃত্যুর সংখ্যা চার শতাধিক। আক্রান্ত ও মৃতদের অধিকাংশই শিশু। এই সংকটের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, চিকিৎসকসহ পরিচিত ব্যক্তিদের নামে ভুয়া মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব ফটোকার্ড আকারে প্রচার করা হচ্ছে। যাচাই করা গেছে, এসব পোস্টের উৎস বিভিন্ন সার্কাজম বা স্যাটায়ার ফেসবুক পেজ। তবে অনেকে এগুলোকে সত্য মনে করে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

উদাহরণস্বরূপ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহকে উদ্ধৃত করে একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়েছে, ‘হাম ইস্যুতে ড. ইউনূস স্যারকে ফাঁসাতে পরিকল্পিতভাবে শিশুদের মেরে ফেলা হচ্ছে।’

যাচাইয়ে দেখা গেছে, হাসনাত আবদুল্লাহ এমন কোনো মন্তব্য করেননি। পোস্টগুলো পর্যবেক্ষণ করে দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায়নি। তাঁর ফেসবুক পেজ, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষাৎকার বা বক্তব্যেও এমন কিছু নেই।

এই ফটোকার্ডটির উৎস ‘দৈনিক মোল্লার দেশ’ নামক ফেসবুক পেজ। এই পেজ থেকেই পোস্টটি ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে।

একই পেজে আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে উদ্ধৃত করে একটি ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট করা হয়েছে। সেখানে দাবি, ‘হামে এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে কয়েক শত শিশু মারা গেছে, অথচ গাজায় এক দিনেই হাজার হাজার শিশু মারা যায়। আমি ছোটখাটো ইস্যুতে কথা বলি না।’

কিন্তু তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেজ, সাক্ষাৎকার বা গণমাধ্যমে এমন কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

একই পেজে আইনজীবী ও উপস্থাপক মানজুর আল মতিনকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘হামে শিশু মৃত্যুর জন্য ড. ইউনূস স্যার দায়ী নয়, এর জন্য দায়ী অতিরিক্ত গরম। তীব্র গরম সহ্য করতে না পেরে শিশুরা মারা যাচ্ছে।’

অথচ মানজুর আল মতিনের এমন কোনো বক্তব্য কোথাও নেই।

হাম নিয়ে আরেকটি ভাইরাল ফটোকার্ডে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘দেশে কোনো হাম নেই, হসপিটালের ফ্যাসিস্ট ডাক্তাররা ড. ইউনূসকে ফাঁসাতে পরিকল্পিতভাবে শিশুদের মেরে ফেলতেছে।’

যাচাইয়ে দেখা গেছে, এটি ‘Bengali Steam’ নামক সার্কাজম পেজ থেকে শুরু। ৭ মে পোস্টটি প্রকাশের পর এটি সত্যিকারের মন্তব্য হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। কোনো সংবাদমাধ্যম বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে এর সত্যতা পাওয়া যায়নি।

বরং ৭ মে চট্টগ্রামের এক অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘দেশে হামের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে। শতাধিক শিশু মারা গেছে। এই সংকটের জন্য যারা প্রকৃতভাবে দায়ী, তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু শুধু পূর্ববর্তী সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে দিয়ে বর্তমান সরকার নিজেদের দায় এড়িয়ে যেতে পারে না।’

একই ‘Bengali Steam’ পেজ থেকে নোয়াখালী-৬ আসনের এনসিপি সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদকে উদ্ধৃত করে একটি ফটোকার্ড ছড়ানো হয়েছে। সেখানে দাবি, ‘পাবলিকের কান্নাকাটি দেখলে মনে হয় হামে ১ লাখ শিশু মারা গেছে। আরে ভাই, সংখ্যাটা এখনো ১ হাজারও হয়নি।’

একই পেজে এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমকে নিয়ে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়েছে। সেখানে তাঁকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘হাম নিয়ে এত ব্যস্ততার কী আছে? হাম আল্লাহর একটি পরীক্ষা মাত্র। হামে কিছু শিশু মারা যাবে, তার দ্বিগুণ শিশু জন্মাবে, এটাই তো স্বাভাবিক।’

তবে সারজিস আলমও এমন কোনো বক্তব্য দেননি। সংবাদমাধ্যমে তাঁর এমন কোনো প্রকাশিত সংবাদ নেই।

এছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেনকে উদ্ধৃত করে এক পোস্টে দাবি, ‘হাসপাতালে যত শিশু মারা যাচ্ছে, সবাইকে হাম বলে চালিয়ে দিচ্ছে একটা কুচক্রী মহল। মূলত সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এই কাজ করা হচ্ছে।’

মন্ত্রীর এই বক্তব্যের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে উদ্ধৃত করে এক ফটোকার্ডে দাবি, ‘হামে যারা মারা যাবে তারা সবাই শহীদ। আপনারা কি চান না আপনাদের বাচ্চারা শহীদি মর্যাদা পাক?’

শফিকুর রহমান এমন কথা বলেছেন, তা কোনো সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায়নি। এই পোস্টের উৎস ‘গুপ্ত টেলিভিশন’ নামক সার্কাজম পেজ।

একই পেজে কুষ্টিয়া-৩ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য আমির হামজাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘হাম নিয়ে ড. ইউনূস স্যারকে গালি দিয়ে লাভ আছে? দেখা যাবে আল্লাহর রহমতে হামে মৃত্যু হওয়া ১টি শিশুর বিপরীতে ১০টি শিশুর জন্ম হয়েছে।’

সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে আলোচিত চিকিৎসক তাসনিম জারাকে উদ্ধৃত করে আরেক ফটোকার্ডে দাবি, ‘অনেকেই প্রশ্ন করছেন আমি হাম নিয়ে কোনো কথা কেন বলছি না। আমার সব সময় মনে হয়েছে হামের চেয়ে যৌন সমস্যা নিয়ে কথা বলা বেশি জরুরি।’

‘দৈনিক মোল্লার দেশ’ পেজের বায়োতে লেখা আছে, এটি স্যাটায়ার পেজ। ‘Bengali Steam’ এবং ‘গুপ্ত টিভি’ পেজেও তাই। কিন্তু এসব পোস্টকে সত্যিকারের ভেবে অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। স্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে এভাবে ভুল তথ্য ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে।