২০১০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ ফুটবলপ্রেমীদের কাছে যতটা স্মরণীয়, ততটাই জনপ্রিয় হয়েছে এর দুটি গান। ফিফার অফিশিয়াল থিম সং ‘ওয়াকা ওয়াকা’ এখনো সবার জিভে। আর অফিশিয়াল গান না হলেও কে’নানের ‘ওয়েভিং ফ্ল্যাগ’ তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সময়ের স্রোতে এই সোমালিয়ান শিল্পীর জীবনে এখন ঝড়ো হাওয়া বইছে।

কে’নান নামে সকলে চেনলেও তাঁর পূর্ণ নাম কেইনান আবদি ওয়ারসামে। সোমালিয়ায় জন্মগ্রহণকারী কে’নান গান ও কবিতার পরিবেশে বড় হয়েছেন। তাঁর দাদা ছিলেন বিখ্যাত কবি, চাচি গাইতেন গান। জন্মের পরপরই বাবা মারা যান এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে চলে যান। সেখানে ট্যাক্সি চালিয়ে সংসার চালাতেন।

কিন্তু ১২ বছর বয়সে শুরু হয় সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধ। চোখের সামনে গুলিতে তিন বন্ধুর প্রাণহানি দেখেছেন কে’নান। স্কুলের মাঠে খেলতে গিয়ে একদিন ভুল করে গ্রেনেড তুলে নেন হাতে। ভাগ্যবশত সেদিন বেঁচে ফিরেছিলেন।

এরপর কে’নানের মা সিদ্ধান্ত নেন পুরো পরিবার নিয়ে নিউইয়র্কে যাওয়ার। ১৩ বছর বয়সে শরণার্থী হয়ে নিউইয়র্কে পৌঁছান কে’নান ও পরিবার। এক বছর পর তারা চলে যান কানাডার টরন্টোর অন্টারিওতে, যেখানে এখনো বাস করছেন তিনি।

কানাডায় আসার পর ইংরেজি ভাষা নিজে নিজে শিখে ব্যান্ডে যোগ দেন কে’নান। গানের মাধ্যমে সোমালিয়ানদের দুঃখ-কষ্টের কথা প্রকাশ করতে থাকেন। এতে তিনি সোমালিয়ার যুদ্ধবিরতির একজন প্রধান কণ্ঠস্বরে পরিণত হন।

জাতিসংঘের আয়োজনে নিয়মিত পারফর্ম করেন এবং যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান তিনি। ২০০২ সালে প্রথম অ্যালবাম মুক্তি পায়। কিন্তু ২০০৮ সালে দ্বিতীয় অ্যালবামের মাধ্যমে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছান। এই অ্যালবামের একটি গান ছিল ‘ওয়েভিং ফ্ল্যাগ’।

শাকিরা বললেন, সৃষ্টিকর্তা খুব অল্প কিছু মানুষের জন্য সুখ বানিয়েছেন।

২০১০ বিশ্বকাপে ‘ওয়েভিং ফ্ল্যাগ’ সকলের মুখে মুখে ঘুরছিল। দেড় দশক অতিক্রান্ত হলেও ফুটবলের গান হিসেবে এটি মনে পড়ে। অথচ গানটি ফুটবলের জন্য লেখা ছিল না, বিশ্বকাপ কেন্দ্রিকও নয়।

কে’নানের ২০০৮ সালে মুক্ত ‘ট্রুবাদো’ অ্যালবামের এই গানটি সোমালিয়ার যুদ্ধ-বিগ্রহ ও সাধারণ মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লেখা।

২০০৯ সালে কোকাকোলা এই গানটি পছন্দ করে। বিশ্বকাপের জন্য তারা সবসময় নিজেদের গান মুক্তি দেয়। কিন্তু কে’নানের গান এত ভালো লাগে যে নতুন গান না বানিয়ে তাঁর সঙ্গে হাত মেলান।

অবশেষে বিশ্বকাপের জন্য গানটিতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়। মূল কথা অপরিবর্তিত রেখে সুর ও কয়েকটি পঙক্তি যোগ করে বিশ্বকাপের আবহ তৈরি করা হয়।

কে’নানের গানের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের প্রতিটি কোণে। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও এর সুরে সবাই মাতিয়েছিল।

বিশ্বকাপের জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে কে’নান পান ২০১০ সালে জুনো অ্যাওয়ার্ডস, ২০১২ ও ২০১৭ সালে এমটিভি অ্যাওয়ার্ড এবং ২০২৪ সালে গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড। এমনকি ২০২৪ সালে ‘মাদার মাদার’ নামক একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমাও পরিচালনা করেন, যার জন্য টরন্টো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কার পান।

কিন্তু এরপর কে’নানের জীবনে ঝড় নেমে আসে। যে ঝড় জনপ্রিয়তার শিখরে দানা বেঁধেছিল।

তিসি-তিল-কুমড়ার মতো বীজজাতীয় খাবার কারা খাবেন, কারা খাবেন না।

২০২২ সালের শেষভাগে এক নারী কে’নানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন। ঘটনা ঘটে ২০১০ সালের জুলাইয়ে কিউবেক শহরের এক কনসার্টে। অভিযোগকারী নারীও সংগীতশিল্পী। ২০২২ সালে মন্ট্রিয়লে অভিযোগ দায়েরের পর ২০২৪ সালে মামলা হয়। এরপর থেকে কে’নান প্রায় নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন।

আদালতে কে’নান দাবি করেছেন, তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ। তবে অভিযোগের পর গানের জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন। গত দুই বছর তাঁকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। মামলাটি এখনো আদালতে বিচারাধীন।