সনি লিভ-এ মুক্তি পাওয়া ‘জ্যাজ সিটি’ সিরিজে আরিফিন শুভর অভিনয় সবার প্রশংসা পেয়েছে। তিনি ঈদুল আজহায় মুক্তির অপেক্ষায় থাকা সিনেমা ‘মালিক’-এর শুটিং সম্পন্ন করেছেন। এছাড়া ‘ঠিকানা বাংলাদেশ’ ছবিও মুক্তির জন্য প্রস্তুত। বাংলাদেশ ও ভারতের একাধিক প্রকল্পে তার কথা চলছে। মনজুর কাদের শুভর সাম্প্রতিক খবর নিয়েছেন।

‘জ্যাজ সিটি’তে জিমি রায়ের চরিত্রে শুভের লুক ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ভক্ত থেকে দেশের অনেক তারকার পছন্দ হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, দেশের পরিচালকেরা কেন শুভকে এভাবে পর্দায় উপস্থাপন করতে পারেন না! তাঁকে নিয়ে দেশের পরিচালকদেরও আলাদা করে ভাবা দরকার। সিরিজে নিজের চরিত্র নিয়ে শুভের প্রত্যাশা ছিল না। তিনি বলেন, “খুবই নার্ভাস ছিলাম। কারণ, এটা আমার কমফোর্ট জোনের বাইরের এলাকা। ভিন্ন লোকেশন, ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা। তারপরও শতভাগ দেওয়ার চেষ্টা করেছি।”

ভারতীয় টিমের সঙ্গে আগেও কাজ করেছেন শুভ। তবে ‘মুজিব’-এর অভিজ্ঞতা ভিন্ন ছিল। তিনি বললেন, শ্যাম বেনেগালের মতো পরিচালকের ইউনিট অন্য ইউনিটের থেকে আলাদা। ৮৫ বছর বয়সী একজনের সঙ্গে কাজ এবং এখনকার পরিচালকের সঙ্গে কাজের ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন। সৌমিক সেন পরিচালিত সিরিজটির শুটিং হয়েছে মুম্বাই ও পশ্চিমবঙ্গে। প্রকল্পের জন্য শুভ তিন মাসের বেশি সময় ধরে প্রস্তুতি নিয়েছেন। অনলাইন প্রশিক্ষকের মাধ্যমে হিন্দি ও উর্দু শিখেছেন। শুভ বলেন, “কেউই হয়তো ভাবেননি, এমন সাড়া ফেলবে বা মানুষ এতটা পছন্দ করবেন। আমাদের এখানে অনেকেই সরাসরি বলিউডে কাজ করেননি।” সামনে নতুন কাজ নিয়ে আলোচনা চলছে, তবে এখনই কিছু বলছেন না শুভ।

কেন ঈদকেন্দ্রিক
সাইফ চন্দন পরিচালিত ‘মালিক’-এর শুটিং শেষ হয়েছে। ছবি নিয়ে এখনই কিছু বলতে নারাজ শুভ। গেল কয়েক বছরে ঢালিউডে ঈদকেন্দ্রিক সিনেমার প্রবণতা নিয়ে তিনি বলেন, বড় প্রযোজনা ও তারকানির্ভর ছবিগুলো মূলত ঈদের জন্য তৈরি হচ্ছে। সারা বছর সিনেমা নির্মাণ না হওয়ায় আক্ষেপ করলেন শুভ। শিল্পীরা উৎসবকেন্দ্রিক কাজের জন্য বসে থাকেন না। তাঁর ভাষায়, “সারা বছরই তো কাজ হওয়া উচিত। দর্শকও আছেন। দর্শক অনেক সময় ভাবেন, আমরা চাই না কাজ হোক, বাস্তবতা তা নয়। ছবির অর্থলগ্নিকারক ও প্রযোজকদেরই এসব নিয়ে ভাবতে হবে।” ঈদ ছাড়াও পয়লা বৈশাখ, ক্রিসমাস, পূজা বা ভালোবাসা দিবসে সিনেমা নির্মাণ বাড়ানোর আহ্বান জানালেন শুভ। তিনি বলেন, টেলিভিশনে সারা বছর বিশেষ দিবসকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করা হয়, সিনেমাতেও আগে এমন ছিল, এখন কমে গেছে।

শুভর মতে, বছরে পাঁচ–ছয়টি ভালো কাজ নিয়মিত করা সম্ভব। তবে ঈদের মতো বড় কাজ অন্য সময়ে প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। তিনি প্রশ্ন তুললেন, কেন সারা বছর সিনেমা নির্মাণের ধারাবাহিকতা নেই—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই ও সরকারের ভাবা উচিত।

‘ঠিকানা বাংলাদেশ’, অন্যরকম অভিজ্ঞতা
মুক্তির অপেক্ষায় ‘ঠিকানা বাংলাদেশ’। ২০১৯–২০ অর্থবছরে সরকারি অনুদানের এই সিনেমার নাম শুরুতে ছিল ‘ফুটবল ৭১’। শুভ জানালেন, ছবিটি ঈদের পর যেকোনো সময় মুক্তি পেতে পারে। এটি ভিন্নধর্মী গল্প। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, স্পোর্টসম্যানশিপ, প্রণয় ও মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনের দিক উঠে এসেছে। শুভ বলেন, নির্মাতা অনম বিশ্বাসের কাজে ছবি নিয়ে প্রত্যাশা রাখা যায়।

পরিচালকদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে শুভ বলেন, বাংলাদেশের অনম বিশ্বাস ও তানিম নূর অমায়িক ও মেধাবী। ওটিটি কনটেন্ট কন্ট্র্যাক্টে তানিম নূরের সঙ্গে কাজ করে বলেন, “আমাদের দেশের অনেক শুটিং সেটে নায়কেরা সময়মতো না এলে তিনি বড় নায়ক। পরিচালকেরা হাইপার না হলে বড় পরিচালক হন না। কিন্তু তানিম নূর ব্যতিক্রম—অত্যন্ত ঠান্ডা, ভদ্র এবং মিষ্টভাষী। অনম বিশ্বাস কম কথা বলেন, কিন্তু কাজে গভীর মনোযোগী।”

এক ফ্রেমে দেখার স্বপ্ন
গেল বছরের ঈদুল আজহায় শুভ অভিনীত ‘নীলচক্র’ ও শাকিব খানের ‘বরবাদ’ মুক্তি পায়। এবার ঈদে শুভের ‘মালিক’ ও শাকিবের ‘রকস্টার’ আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা উঠেছে ‘শাকিব খানের মুখোমুখি আরিফিন শুভ’। কেউ এটাকে প্রতিযোগিতা বলছেন, কেউ তুলনা অপ্রয়োজনীয় মনে করছেন। শুভ বললেন, “এই যে একধরনের ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়, এক নম্বর, দুই নম্বর, তিন নম্বর—এই ধরনের র‌্যাঙ্কিং মূলত চাপিয়ে দেওয়া, যা ঘোড়ার রেসের মতো প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত। শিল্পীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়।”

শুভ এখন ‘পৃথিবীর জন্য বাঁচা’র চাপ অনুভব করেন না, নিজের মতো করে কাজ করতে চান। একজন দর্শক শাকিব খান, শরীফুল রাজ, সিয়াম বা অন্যের সিনেমা দেখতে পারেন। দর্শককে ভাগ করে দেখার মানসিকতা থেকে বের হওয়া দরকার। শাকিব খান, আরিফিন শুভ, সিয়াম, রাজ, মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী যদি এক ছবিতে কাজ করেন, তা দেশের সিনেমার জন্য বড় অর্জন। শুভ বললেন, “সঠিক চরিত্রায়ণ ও শক্তিশালী চিত্রনাট্য থাকলে কোনো শিল্পীই এমন প্রজেক্টে না করবেন না।” সমস্যা শিল্পীদের অনাগ্রহে নয়, বড় প্রযোজনা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে। তিনি বলেন, “যদি শাকিব খান, শুভ, রাজ, সিয়াম, মোশাররফ করিম ও চঞ্চল চৌধুরীর মতো শিল্পীরা একসঙ্গে কাজ করেন, কমপক্ষে দেশের ২০ কোটি মানুষের পাঁচ–ছয় কোটি মানুষ ছবিটা দেখবেই। কারণ, দর্শকের আগ্রহ আছে, দরকার পরিকল্পিত উদ্যোগ।”

সময় কাটে যেভাবে
শুভের ফিটনেস সচেতনতা সবাই জানেন। তিনি বলেন, “যদি কোনো দিন চাঁদেও থাকি, সেখানেও জিম বের করব। শুধু ফিটনেসের জন্য হলে এত বছর নিয়মিত থাকতে পারতাম না। মানসিক প্রশান্তির জন্য জিমে যাই। ২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি মাকে কবরে শোয়ানোর পরদিনই কস্টিউম ট্রায়াল দিয়েছি, ২৭ তারিখে শুটিংয়ে গেছি—এটা পারতাম না, যদি মানসিকভাবে শক্ত না থাকতাম। জিম, শরীরচর্চা বা দৈহিক প্রশিক্ষণ—সবকিছুর মূলে মানসিক প্রশান্তি।”

জিমের বাইরে ঘুরে বেড়ানো, সিনেমা-সিরিজ দেখে সময় কাটান শুভ। নিজের ‘জ্যাজ সিটি’ দেখে ভালো লেগেছে। সম্প্রতি ‘স্বপ্নে ভার্সেস এভরিওয়ান’ও দেখেছেন। শুভ বলেন, “মূল অভিনয়শিল্পীই এটার লেখক ও পরিচালক। একজন অভিনেতা হয়েও তিনি (অমব্রিশ ভার্মা) যেভাবে কাজ করেছেন, তা সত্যিই দারুণ। তাঁর মধ্যে আমাদের নায়ক আলমগীর সাহেবের ছাপ খুঁজে পাই। তিনিও ছিলেন একজন সফল নির্মাতা।”