সিডনি বিদায়ের মুহূর্তে লুইপা ও মেজবা বাপ্পীর চোখেমুখে যেন শহরের আবেগ লেগে ছিল। বিমানবন্দরে প্রবাসীদের ভালোবাসায় উচ্ছ্বসিত হয়েও বিচ্ছেদের বিষণ্নতা মিশে ছিল তাঁদের কণ্ঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদায় জানাতে গিয়ে তাঁরা লিখেছেন, ‘বিদায় সিডনি, তোমাদের ভালোবাসা অনেক মিস করব।’
কয়েক দিনের সংক্ষিপ্ত সফরে দুই কণ্ঠশিল্পী প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে গান, আড্ডা ও স্মৃতির মুহূর্তে মেতে উঠেছেন। বড় মঞ্চ থেকে শুরু করে ঘরোয়া বৈঠকি সন্ধ্যা—প্রতিটি জায়গায় তাঁরা পেয়েছেন উষ্ণ অভ্যর্থনা। বাংলাদেশ মেডিকেল সোসাইটি নিউ সাউথ ওয়েলসের আমন্ত্রণে কয়েক দিন আগে সিডনিতে পৌঁছান এই শিল্পী। ৯ মে চিকিৎসকদের বার্ষিক আয়োজনে গান পরিবেশনের পর ১২ মে তাঁরা অংশ নেন এক অন্তরঙ্গ বৈঠকি সন্ধ্যায়। সিডনির জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক নাজমুন নাহারের বাসভবনে আয়োজিত সেই আসর হয়ে ওঠে আবেগময় মিলনমেলা।
ছিমছাম আয়োজনে লুইপা পরিচিত গানগুলো একের পর এক গেয়ে শোনান। ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’ গানের প্রথম সুরে ঘরে নেমে আসে গভীর নীরবতা। এরপর ‘যখন থামবে কোলাহল, ঘুমে নিঝুম চারিদিক’—লুইপার কণ্ঠে গানগুলো প্রবাসের মাটিতে নতুন প্রাণ পায়। অন্যদিকে মেজবা বাপ্পী গাইেন ‘ওরে নীল দরিয়া’, ‘যারে দেখি লাগে ভালো’, ‘অলির কথা শুনে বকুল হাসে’ ও ‘আমি বাংলায় গান গাই’।
তাঁদের গানে প্রবাসীরা যেন ফিরে যান চেনা বাংলাদেশে। ‘ওরে সালেহা, ওরে মালেকা’ গানে অনেকে গুনগুন করে গলা মেলান, পরিবেশ হয়ে ওঠে নস্টালজিক।
অনুষ্ঠানে মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে কথা বলেন লুইপা। তিনি বলেন, ‘সিডনিতে এসে আমরা যে ভালোবাসা পেয়েছি, তা সত্যিই অভাবনীয়। চিকিৎসকদের মতো মহৎ পেশার মানুষদের সামনে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা আলাদা। বড় মঞ্চে আলো-ঝলকের মধ্যে নয়, একেবারে কাছাকাছি বসে গান গাইলে মানুষের চোখের ভাষা বোঝা যায়। তখন বুঝতে পারি, গানটা তাঁদের ভেতরে পৌঁছেছে কি না। সেটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া।’ ২০১০ সালে ‘চ্যানেল আই সেরা কণ্ঠ’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া এই শিল্পী আরও বলেন, ‘প্রবাসে থাকা মানুষ দেশ থেকে দূরে থাকলেও তাঁদের হৃদয়ে বাংলাদেশ সব সময় বেঁচে থাকে। আমরা যখন গান গাই, তখন সেই দেশটা যেন আরও একটু কাছে চলে আসে। এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।’
২০১২ সালে ‘চ্যানেল আই সেরা কণ্ঠ’ ও পরে ভারতের ‘সা রে গা মা পা’য় অংশ নিয়ে পরিচিতি পাওয়া মেজবা বাপ্পীও সিডনির অভিজ্ঞতায় মুগ্ধ। তিনি বলেন, ‘প্রবাসের মাটিতে দর্শকদের এই প্রাণবন্ত উপস্থিতি আর গানের প্রতি গভীর ভালোবাসা আমাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করেছে। সিডনির মানুষ খুবই আন্তরিক ও শিল্পমনা। অপেরা হাউস, হারবার ব্রিজ—সবকিছুই অসাধারণ। তবে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে এখানকার বাংলাদেশিদের ভেতরে দেশের প্রতি টানটা এখনো এত গভীরভাবে বেঁচে আছে দেখে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই সফরের স্মৃতি আমরা অনেক দিন মনে রাখব। বারবার এই শহরে ফিরে আসতে ইচ্ছে করবে।’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত চিকিৎসক মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ‘এভাবে কাছাকাছি বসে গান শোনার আনন্দই আলাদা। মনে হয়, শিল্পী যেন শুধু আমার জন্যই গাইছেন।’ চিকিৎসক আজিজ জামান বলেন, ‘লুইপা ও মেজবা বাপ্পীর কণ্ঠে পরিচিত গানগুলো শুনে মনে হচ্ছিল, যেন বহু বছর পেছনে ফিরে গেছি। তাঁদের গলায় যে আন্তরিকতা আর উষ্ণতা, তা সত্যিই বিরল। এই ঘরোয়া সংগীত সন্ধ্যা দীর্ঘদিন মনে থাকবে।’ উপস্থিত আরেক চিকিৎসক মাসুম আহমেদ বলেন, ‘এত ব্যস্ততার মধ্যেও এই সন্ধ্যায় এসে যেন একটু নিশ্বাস ফেলতে পারলাম। গান কী করে মানুষকে এতটা কাছে নিয়ে আসতে পারে, তা আজ আবার বুঝলাম।’
সিডনি সফরে এই দুই শিল্পী শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানও ঘুরে দেখেছেন। অপেরা হাউস থেকে হারবার ব্রিজ—সবখানেই ছিল তাঁদের পদচারণ। চিকিৎসকদের বার্ষিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে ঘরোয়া বৈঠকি আয়োজন—সব মিলিয়ে সিডনির কয়েকটি দিন তাঁদের জন্য হয়ে থাকল গান, ভালোবাসা আর স্মৃতির এক বিশেষ অধ্যায়।






