উচ্চ রক্তচাপ এমন এক রোগ যার অনেক ক্ষেত্রে কোনো উপসর্গই দেখা যায় না। রোগী নিজেকে একদম সুস্থ মনে করেন। কিন্তু নীরবে শরীরের ক্ষতি চলতে থাকে এবং দীর্ঘদিন পর মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়। এ বিষয়ে স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের হৃদ্‌রোগ বিভাগের অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট ডা. আসিফ মনোয়ার-এর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন রাফিয়া আলম

একটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দৃশ্য কল্পনা করুন। স্বজনেরা অজ্ঞান অবস্থায় এক রোগীকে নিয়ে এসেছেন। পরীক্ষায় দেখা গেল, রক্তচাপ ২২০/১১০। কিন্তু কেউ জানতেন না তাঁর উচ্চ রক্তচাপ আছে! সিটি স্ক্যানে ধরা পড়ল মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। উচ্চ রক্তচাপের কারণে মস্তিষ্কের রক্তনালি ছিঁড়ে এই ঘটনা ঘটেছে। তার আগে তিনি কখনো অসুস্থ বোধ করেননি বা রক্তচাপ পরীক্ষা করেননি।

দেশের হাসপাতালগুলোতে এমন ঘটনা ঘন ঘন ঘটে। একটু সচেতনতা থাকলেই এসব মারাত্মক সমস্যা এড়ানো যেত। অনেকে নিজের যত্ন নেন না, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা সম্পর্কে অজ্ঞাত বা জেনেও পালন করেন না। সুস্থ অবস্থায় রক্তচাপ বা রক্তের সুগার মাপার প্রয়োজন বোধ করেন না।

উচ্চ রক্তচাপের কারণে কী ধরনের জটিলতা হতে পারে, তা জেনে নেওয়া যাক।

হৃৎপিণ্ড হয় আক্রান্ত

রক্তচাপ বেশি থাকলে হৃৎপিণ্ডের উপর চাপ পড়ে। স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কাজ করতে গিয়ে হৃৎপিণ্ডের বাঁ পাশের নিচের অংশ বা প্রকোষ্ঠ (ভেন্ট্রিকল) বড় হয়। পরে হৃৎপিণ্ডের কার্যক্ষমতা কমে যায়, যাকে বলে হার্ট ফেইলিওর। এতে ফুসফুসে পানি জমে।

হৃৎপিণ্ডের রক্তনালির কার্যকারিতাও নষ্ট হয়, ফলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে।

মস্তিষ্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব

মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণকে চিকিৎসায় বলে হেমোরেজিক স্ট্রোক। আরেক ধরন ইশকেমিক স্ট্রোক, যেখানে রক্তনালির প্রবাহ বন্ধ হয়। উচ্চ রক্তচাপ দুই ধরনের স্ট্রোকের ঝুঁকিই বাড়ায়।

এছাড়া মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হয়, কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয় এবং স্মৃতিভ্রম হতে পারে।

আরও অনেক জটিলতা

কিডনির রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ছাঁকনী প্রক্রিয়ায় বাধা পড়ে। কিডনির কার্যক্ষমতা কমে এবং দীর্ঘমেয়াদি কিডনির রোগের ঝুঁকি বাড়ে।

চোখের রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি কমে বা অন্ধত্ব ঘটতে পারে। নাক দিয়ে রক্ত পড়াও উচ্চ রক্তচাপের কারণে হয়। রক্তনালি ফুলে রক্তক্ষরণ বা চিরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। দাম্পত্য জীবনের অন্তরঙ্গতাও ব্যাহত হয়, পুরুষ-নারী উভয়ের ক্ষেত্রেই।

গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি

গর্ভকালে উচ্চ রক্তচাপে প্রিএকলাম্পসিয়া ও একলাম্পসিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, অকালে জন্ম নিতে পারে। মা ও শিশুর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।

রক্তচাপ জানাই জরুরি

এসব জটিলতা এড়াতে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খেতে হবে এবং নিয়মিত মাপতে হবে। কোনো সমস্যা না থাকলেও ছয় মাস অন্তর রক্তচাপ পরীক্ষা করা উচিত।

যেকোনো বয়সে উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে। আঠারো বছর বয়সের পর থেকে বিশ্বব্যাপী অনেকে আক্রান্ত। আঠারো পূর্বেও হতে পারে, তবে আঠারো পূর্ণ বয়সীদের সচেতন হতে হবে। বাড়িতে ভালো রক্তচাপমাপক যন্ত্র থাকলে সবার পরীক্ষা করা সহজ।

স্বাস্থ্যকর জীবনধারা গড়ুন

শৈশব থেকে সুস্থ জীবনধারা গড়ে ওঠে, তবে যেকোনো বয়সে শুরু করা যায়। পরিবার সকলে যোগ দিন, শিশু-কিশোর থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ সবাইকে উৎসাহিত করুন।

খাদ্যাভ্যাসে স্বাস্থ্যকর তেল সীমিত পরিমাণে ব্যবহার করুন। চর্বিযুক্ত খাবার, ফাস্টফুড এড়ান। উদ্ভিজ্জ খাবার বাড়িয়ে খান। লবণ কম খান, পাতে বাড়তি লবণ নেবেন না। চানাচুর, চিপস, ইনস্ট্যান্ট নুডুলস, সস, কেচাপ, কাসুন্দি কম খান। অ্যালকোহল ও তামাকজাত পণ্য পরিহার করুন।

প্রতিদিন শরীরচর্চা করুন। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি ব্যায়াম বা ৭৫ মিনিট ভারী ব্যায়াম করুন, মিশিয়ে নিতেও পারেন। সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পেশিবলক বাড়ানোর ব্যায়াম করুন।

প্রাপ্তবয়স্কদের রাতে ৭-৯ ঘণ্টা ঘুম দরকার। মানসিক চাপ কমান, জীবন সহজ রাখুন। সাফল্যের পিছে ছুটবেন না, সন্তানদের চাপ দেবেন না। প্রকৃতির কাছে সময় কাটান, বারান্দা-ছাদে বাগান করুন বা পোষা প্রাণীর যত্ন নিন।