জ্যাকুইনিয়া উদ্ভিদজগতের এক অনন্য ও বিস্ময়কর গাছ। এই চিরসবুজ ছোট বৃক্ষ মূলত মধ্য আমেরিকা, মেক্সিকো এবং ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের আদি বাসিন্দা হলেও এখন বাংলাদেশের বাগানেও এর উপস্থিতি লক্ষণীয়। এর বিন্যাস, রঙ এবং স্নিগ্ধ সুবাস এটিকে অন্য উদ্ভিদ থেকে আলাদা করে তোলে। গত ১৮ এপ্রিল বিকেলে ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে ঘুরতে গিয়ে এই গাছের ফুল দেখে ফেলি।
জ্যাকুইনিয়া গাছ খুব ধীরে ধীরে বাড়ে। এর ডালপালা চারদিকে ছড়িয়ে থাকে, যা গাছটিকে সুন্দর গোল ঝোপালো আকার দেয়। এর পত্রবিন্যাস অদ্ভুত ও আকর্ষণীয়। পাতাগুলো গাঢ় সবুজ, পুরু এবং চামড়ার মতো শক্ত। পাতা সুচালো বা কাঁটার মতো তীক্ষ্ণ, যা দেখতে ছোট বর্শার ফলার মতো। রোদে ঘন সবুজ পাতাগুলো চকচক করে, বাগানে সজীবতা ছড়ায়।
গাছের ফুলগুলো আকারে ছোট, ব্যাস মাত্র ১ সেন্টিমিটার। ফুলের গঠন অদ্ভুত। পাপড়ি পাঁচটি হলেও পাঁচটি বন্ধ্যা পুংকেশর পাপড়ির মতো দেখায়, দূর থেকে মনে হয় পাপড়ি ১০টি। ফুলের কেন্দ্রে গর্ভদণ্ড ঘিরে পাঁচটি উর্বর পুংকেশর থাকে। জ্যাকুইনিয়ার ফুল প্রথমে হলদে কমলা রঙের থাকে, পরে ধীরে ধীরে লাল হয়। ফুলগুলো থোকায় থোকায় ফুটে পাতার নিচে কিছুটা আড়ালে থাকতে পছন্দ করে। দীর্ঘ সময় ফুলগুলো সতেজ হয়ে থাকে, এটাই এর বড় বৈশিষ্ট্য।
উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম Bonnelia monocarpa। এটি Primulaceae পরিবারের ছোট বৃক্ষ। আগে এর নাম ছিল Jacquinia macrocarpa। ক্যারোলাস লিনিয়াস Jacquinia গণের নামকরণ করেছিলেন ফরাসি উদ্ভিদবিজ্ঞানী নিকোলাস জোসেফ ভন জ্যাকুইনের প্রতি সম্মানে। ফলের গঠন থেকেই ‘ম্যাক্রোকার্পা’ নামের যথার্থতা বোঝা যায়, যার অর্থ বড় ফল। ফুলের তুলনায় ফল বেশ বড়। পাকা ফল উজ্জ্বল কমলা বা লাল হয়। গত বছরের ৮ অক্টোবর এই গাছের ফল দেখি এবং হাত দিয়ে ধরতে গিয়ে সুচালো কাঁটায় খোঁচা খাই।
জ্যাকুইনিয়া অত্যন্ত সহনশীল ও কষ্টসহিষ্ণু। তাই খুব বেশি পানির দরকার পড়ে না, তবে মাটি শুকালে সামান্য পানি দিতে হয়। শুষ্ক, লবণাক্ত ও বালুময় মাটিতে এটি সহজে বাড়ে। শক্ত পুরু পাতা প্রস্বেদন রোধ করে এবং পানি ধরে রাখে। এটি শুষ্ক ও উপকূলীয় অঞ্চলে ভালো জন্মে। কলম বা বীজ দিয়ে বংশবিস্তার সম্ভব। চিরসবুজ প্রকৃতির হওয়ায় সারা বছর বাগান সতেজ রাখে।
জ্যাকুইনিয়া শুধু শোভাবর্ধক নয়, অন্য ব্যবহারও আছে। ছোট আকার ও ঘন পাতার কারণে বেড়া বা বনসাইয়ে ব্যবহৃত হয়। ফুল-পাতা শুকিয়ে গেলেও আকৃতি ও সুবাস ধরে রাখে, তাই ঘর সাজানোর উপকরণ হয়।
আধুনিক ল্যান্ডস্কেপিংয়ে জ্যাকুইনিয়া আদর্শ। ধীরগতির বৃদ্ধির জন্য পছন্দমতো আকার দেওয়া যায়। বাড়ির প্রবেশপথ, সীমানায় বা টব-ড্রামে বারান্দা-ছাদে রাখা যায়। বাগানে আভিজাত্য চাইলে এটি চমৎকার পছন্দ।
জ্যাকুইনিয়া বা Bonnelia monocarpa প্রকৃতির সহনশীল শিল্প। তীক্ষ্ণ পাতার আড়ালে লুকানো সুন্দর ফুল শেখায়, প্রতিকূলতায়ও সৌন্দর্য বজায় রাখতে হয়।
চয়ন বিকাশ ভদ্র: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ






