প্রতি বছর ১৭ মে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস পালিত হয় বিশ্বজুড়ে। এই দিনটি উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে মানুষকে সচেতন করার উদ্দেশ্যে আয়োজিত হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য—একসঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ। সুস্থতা নিয়ে এই দিবসে বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে।

একা উচ্চ রক্তচাপ মোকাবিলা করা যায় না। এবার বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবসের স্লোগানেও তাই সম্মিলিত প্রচেষ্টার দিকে জোর দেওয়া হয়েছে।

সময়মতো জানতে হবে

উচ্চ রক্তচাপকে নীরব ঘাতক বলা হয়। এটি কোনো উপসর্গ ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে হৃদয়, মস্তিষ্ক, কিডনি ও চোখের ক্ষতি করে। তাই সময়মতো শনাক্তকরণই নিয়ন্ত্রণের প্রথম ধাপ। এবং শনাক্তের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো নিয়মিত রক্তচাপ মাপা। আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত যে, উচ্চ রক্তচাপ কেবল বয়স্কদের রোগ। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, জাঙ্ক ফুডের প্রতি ঝোঁক, ধূমপান, মানসিক চাপ এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে তরুণদের মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপ বাড়ছে।

প্রাপ্তবয়স্কদের বছরে অন্তত একবার চিকিৎসকের কাছে গিয়ে রক্তচাপ পরীক্ষা করা উচিত। ঝুঁকিপূর্ণ যারা—যেমন পরিবারে উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস, ডায়াবেটিস, স্থূলতা বা ধূমপানের অভ্যাস থাকলে—তাদের আরও ঘন ঘন পরীক্ষা দরকার। এখন ডিজিটাল ব্লাড প্রেশার মেশিন সহজলভ্য হওয়ায় ঘরে বসে রক্তচাপ মাপা সম্ভব। তবে নির্ভুল ফলের জন্য ভালো মানের যন্ত্র ব্যবহার করতে হবে। যন্ত্রটি সঠিক ফল দিচ্ছে কিনা যাচাই করতে মাঝে মাঝে ম্যানুয়াল যন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করে দেখতে হবে।

ধরা পড়লে কী করবেন

উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়লে নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি জীবনধারার পরিবর্তন এবং প্রয়োজনে নিয়মিত ওষুধ। লবণ কম খাওয়া, সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান ত্যাগ, মাদক বর্জন ও মানসিক চাপ কমানো এসব অভ্যাস খুব কার্যকর। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খেতে হবে। ওষুধ শুরু হলে হঠাৎ বন্ধ করা যাবে না। নিয়মিত রক্তচাপ মাপতে হবে। শুধু রক্তচাপ নয়, উচ্চ রক্তচাপের প্রভাবিত অঙ্গগুলো—যেমন কিডনির কার্যকারিতা, প্রস্রাবে আমিষ, চোখ ও হৃদয়ের সুস্থতা—নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।

সম্মিলিত প্রয়াস

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ একক ব্যক্তির দায়িত্ব নয়, এটি সামাজিক ও সমষ্টিগত প্রয়াস। রোগী, চিকিৎসক, নার্স, পরিবার ও সমাজ—সবাই মিলে এই নীরব ঘাতককে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। রোগীকে সচেতন হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ মানতে হবে। চিকিৎসক রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ ও নিয়মিত ফলোআপ করবেন। নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা রোগীর শিক্ষায় ভূমিকা রাখবেন, পরিবার সহায়তা, অনুপ্রেরণা ও মানসিক সমর্থন দেবে। বিশেষ করে বয়স্কদের ওষুধ গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

আসুন, আমরা নিজেরা সচেতন হই, নিয়মিত রক্তচাপ মাপি এবং পরিবার-পরিজনকেও এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করি।

ডা. মো. তৌফিকুর রহমান, অধ্যাপক, হৃদ্‌রোগ বিভাগ, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা