সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে বোরো ধানের পাশাপাশি ক্ষীরা ও মরিচির ফসলও নষ্ট হয়েছে। এ ক্ষতিতে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক আবদুল জাহান। তাঁর ১৬ বিঘা জমির ধান পানিতে ডুবে যাওয়ায় ঋণের বোঝা ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি।

৫৫ বছর বয়সী আবদুল জাহান হাওরপাড়ের সচ্ছল কৃষক। তাঁর পাঁচ সন্তান সবাই লেখাপড়া করছে—কেউ স্কুলে, কেউ কলেজে, কেউ মাদ্রাসায়। সংসারের খরচ বেশি হওয়ায় তিনি হাওরে বোরো ধানের সঙ্গে ক্ষীরা ও মরিচির আবাদ করেন। কিন্তু এবার অতিবৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে ধানের পাশাপাশি সবজির ফসলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার রাবারবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা। গ্রামের পূর্ব দিকে জেলার সবচেয়ে বড় দেখার হাওরে তাঁর বোরো ধানের জমি। বাড়ির পাশে নদীর তীরে ক্ষীরা ও মরিচির আবাদ করেছিলেন।

‘ক্ষতির জ্বালা তুলিয়া লাভ নাই, খেতে আর পুতে হমান’।

মঙ্গলবার দুপুরে বৈশাখের গাপোটে রোদে ট্রলিতে শুকনো ধান নিয়ে হাওর থেকে বাড়ি ফিরছিলেন জাহান। সঙ্গে ছিলেন ছোট দুই নাতি মাহদি ও মাহবুব। আবদুল জাহান বলেন, যে শুকনো ধান তিনি বস্তায় করে বাড়ি নিচ্ছেন, সেগুলো কাটার পর চার দিন স্তূপ করে রাখা ছিল। খলার ধান নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মাড়াই করা সম্ভব হয়নি। এতে কিছু ধানে চারা গজায় এবং উটকো গন্ধ তৈরি হয়। মাড়াই করে শুকানোর পর গন্ধ চলে গেছে। ধানের মান খারাপ জানিয়ে পাইকার কিনছেন না, তাই বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন।

এবার হাওরে ১৬ বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন জাহান। এছাড়া বাড়ির পাশে তিন বিঘায় ক্ষীরা ও এক বিঘার কিছু বেশি জমিতে মরিচি। মার্চের শেষে শিলাবৃষ্টিতে ক্ষীরা ও মরিচির ব্যাপক ক্ষতি হয়। হাওরের জমিতে প্রথমে জলাবদ্ধতায় ৩ বিঘা এবং ২৬ এপ্রিল থেকে অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে আরও ৮ বিঘা তলিয়ে যায়। বাকি ৫ একরের মধ্যে ৪ একর কেটেছেন। ধানগুলো পানির নিচে আধা পাকা ছিল। এক একর এখনো পানির নিচে। হাওরে পানি বেশি থাকায় কাটা যাচ্ছে না।

টানা রোদে ধানের পচা গন্ধ কাটছে, হাওরে কৃষকের দুঃখ রয়েই গেছে।

হাওরে সংকট না হলে প্রতিবছর গোলায় ৩০০ মণের বেশি ধান তুলতে পারেন জাহান। সংসারে খাবারের জন্য বছরে ৪০ মণ ধান লাগে। বাকিটা বিক্রি করেন। এবার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ঘরের খোরাকির চিন্তায় আছেন। ক্ষীরা থেকে বছরে দেড় লাখ ও মরিচি থেকে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা আয় হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেটাও হচ্ছে না।

কপালের ঘাম মুছতে মুছতে আবদুল জাহান বলেন, ‘আমি সব মিলাইয়া চলি। ধানের লগে বাওয়া খেতিও আছে। ইবার হাওরে ধানের লগে আমার ক্ষীরা, মরিচও নষ্ট অইছে। আমি একবারে শেষ।’ তিনি আরও বলেন, ঘরের আনুষঙ্গিক ব্যয়, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচের জন্যই ধানের পাশাপাশি অন্য শস্য আবাদ করেন। এবার এসব আবাদে ৬০–৭০ হাজার টাকা ঋণ করতে হয়েছে।

হাওরে ফসলহানি: বারবার বিপর্যয়, টেকসই সমাধান কোথায়।

কৃষক জাহান জানালেন, নিজের সংকটের পাশাপাশি ঘরের গরু নিয়েও বিপাকে পড়বেন। হাওরে ধান তলিয়ে যাওয়ায় পর্যাপ্ত খড় তোলা যাচ্ছে না। গোখাদ্যের সংকট দেখা দেবে। এ সংকট তাঁর একার নয়, হাওর এলাকার সব কৃষকের। তিনি বলেন, ‘আমরা ত সবই ধানের ওপরে। ধান না থাকলে আমরার একটা বছর বড় কষ্টে যায়। আর ঋণমুক্ত অইতে সময় লাগে চার থাকি পাঁচ বছর। অখন চিন্তাত আছি কিতা করতাম, কিলা চলতাম।’

৫০০ কোটি টাকার ধানের ক্ষতি

এবার সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টরে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। আবাদি জমির মধ্যে হাওরে (নিচু অংশে) ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর, নন–হাওরে (উঁচু অংশে) ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর।

সুনামগঞ্জে মার্চের মাঝামাঝি থেকে বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টির পানি জমে অনেক হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এরপর ২৬ এপ্রিল থেকে অতিভারী বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢল নামে। এতে জেলার সব হাওরে কমবেশি বোরো ধান তলিয়ে যায়। টানা কয়েক দিন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় কৃষকরা হাওরে নামতে পারেননি। পানিতে কম্বাইন হারভেস্টারে ধান কাটতে সমস্যা হয়। তীব্র শ্রমিকসংকটও দেখা দেয়।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সোমবার পর্যন্ত সুনামগঞ্জে গড়ে ৮৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। সব মিলিয়ে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৯৫৭ হেক্টর। এর মধ্যে হাওরে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮২ হেক্টর এবং নন–হাওরে ৪১ হাজার ২৭৫ হেক্টর। সেই হিসাবে এখনো প্রায় ১৭ শতাংশ কাটা বাকি। অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে জমির ক্ষতির পরিমাণ ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টর। টাকার অঙ্কে ধানের ক্ষতি প্রায় ৫০০ কোটি টাকার।

‘যেগুন ধান পাইছি, অখন খাইতাম না ঋণ দিতাম’।

স্থানীয় কৃষক ও কৃষকের পক্ষে থাকা লোকজন বলছেন, ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি। তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তাঁরা এখনো চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করেননি। ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।