প্রয়াত অভিনেতা আতাউর রহমানের শৈশব কেটেছে নানাবাড়ি নোয়াখালীর শল্লাঘটিয়া গ্রামে। সেখান থেকেই তিনি শৈশবে জীবনের ধারণা গড়ে তোলেন। শিক্ষা, সংস্কৃতি সহ নানা বিষয়ে জানার প্রেরণা পান। এসব তাঁকে আগ্রহী করেছিলেন তাঁর নানা। যাঁকে তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আদর্শ ব্যক্তি মনে করতেন। শৈশবের নানার আদর্শ নিয়ে তাঁর জীবন শুরু হয়। সেই যাত্রা ৮৪ বছর বয়সে থেমে যায়। কদিন ধরে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলেন তিনি। সোমবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

জীবন সম্পর্কে শৈশব থেকে তিনি সত্য কথা বলার চর্চা শিখেছিলেন। জীবন গড়তে বই পড়া জরুরি, এও শৈশবে জানেন। তাঁর মা প্রচুর বই পড়তেন। বাবার কাছ থেকে জীবনের সারল্য শিখেছিলেন। নাটকের প্রতি ভালোবাসাও শৈশবে গড়ে ওঠে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমার বাবা অনেক ভালো ছাত্র ছিলেন। শৈশবে দেখতাম বাবার অভিনয়ের প্রতি ঝোঁক। তিনি ভালো অভিনয় করতেন। সেখান থেকেই আমার অভিনয়ের প্রতি ভালো লাগা শুরু।’

নোয়াখালীতে শৈশব শুরু হলেও পরে তিনি চট্টগ্রামে চলে আসেন। তখন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। চট্টগ্রামে দীর্ঘ সময় কাটে। পড়াশোনায় অমনোযোগী, দুরন্ত কিশোর হয়ে ওঠেন। গানের প্রতি ঝোঁক বাড়ে, কিন্তু নিয়মিত গানের সুযোগ পান না। এইচএসসি পাস করে ঢাকায় আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ঢাকায় এসে হায়দার আকবর খানের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। দুজনেই আজিমপুর কলোনিতে থাকতেন। একসঙ্গে থেকে প্রথমবার ‘রক্ত করবী’ নাটকের মুখস্থ চিত্রনাট্য শোনেন হায়দারের কাছে। এটি তাঁকে আকৃষ্ট করে।

সময়টা ১৯৬০ সাল। আতাউর রহমান খান বলেন, ‘আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা হলের (ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল) ছাত্র। তখন আমার নাটকে প্রবেশ। আবদুল্লাহ আল মামুন আমাকে ও কবি আসাদ চৌধুরীকে দিয়ে অভিনয় করালেন। আমাদের দিলেন গুন্ডার চরিত্র। এভাবে শুরু। পরে তিনি আমাকে বড় চরিত্রে সুযোগ দিলেন। এভাবেই নাট্যচর্চার মধ্যে ঢুকে পড়ি। সেটা সময়ের সঙ্গে বেড়েছে।’

সেই সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য ছিলেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে গিয়ে দৃষ্টি খোলে। ক্যাম্পাস ও হলে নিয়মিত অভিনয় করতেন। আড্ডায় সত্যজিৎ রায়, জহির রায়হানসহ দেশ-বিদেশের গুণী পরিচালকদের সম্পর্কে জানেন, সিনেমা দেখেন। এভাবে ক্যাম্পাসে মননশীল চর্চা বাড়ে।

পড়াশোনা শেষে চাকরিতে যোগ দেন। ছয় বছর পর চাকরি ছাড়েন। সত্তরের দশকে সাংস্কৃতিক চর্চায় ব্যস্ত হন। একাধিক নাটকে অভিনয় করেন। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭২ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্তর ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকে নির্দেশক হিসেবে আবির্ভূত হন। ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘গ্যালিলিও’, ‘ঈর্ষা’, ‘রক্তকরবী’, ‘ক্রয়লাদ ও ক্রেসিদা’, ‘এখন দুঃসময়’, ‘অপেক্ষমাণ’-এর মতো নাটক নির্দেশনা দেন। তিনি বলতেন, ‘অভিনয় খুবই কঠিন। তবু আমি সাহস করে এগিয়েছি। জীবনের প্রতিটি স্তরে শিখেছি।’

স্বাধীনতার আগে মঞ্চ থেকে রেডিও, পরে টেলিভিশনে অভিনয় শুরু করেন। স্বাধীনতার পর সব মাধ্যমে নিয়মিত অভিনয় করেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ার সত্ত্বেও আক্ষেপ ছিল যে অভিনয় হয় না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা অভিনয়কে খুবই সহজ ভাবি। মনে করি অভিনয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম, তাহলেই হয়ে গেল। স্টিফেন স্পিলবার্গের “লিংকন” (২০১২) সিনেমায় ডেনিয়েল ডে-লুইস যখন লিংকন চরিত্রের জন্য চূড়ান্ত হন তখন এক বছর ডেনিয়েল সময় নিয়েছিলেন। এই সময় তাঁর ব্যক্তিত্বই পরিবর্তন হয়ে যায়। সিনেমাটির জন্য তিনি অস্কারে সেরা অভিনয়কারী হন। সেখানে আমরা কী করতে পারছি। আমরা অভিনয়কে খেলা মনে করি। অভিনয় খেলা নয়।’

সাংস্কৃতিক জগতে জন্মস্থান নিয়ে কৌতূহল থাকে। কেউ তাঁকে নোয়াখালীর মানুষ মনে করেন, কেউ চট্টগ্রামের। তিনি মজা করে বলেছিলেন, ‘আমি নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠার কারণে দুই অঞ্চলের ভাষা খুব ভালো পারি। যে কারণে আমাকে কেউ বলে নোয়াখাইল্লা কেউ চাটগাঁইয়া, অনেকে বলে ৬৫/৩৫। দুই অঞ্চলের ভাষার মিশেল বোঝাতে ৬৫ পারসেন্ট ও ৩৫ পারসেন্ট ব্যবহার করে। এগুলো বেশ উপভোগ করি। শৈশবে শেখা ভাষা সহজে ভোলা যায় না। এগুলোর মধ্য দিয়েই তো আমরা বেড়ে উঠি।’

তিনি নিজেকে সুখী মানুষ ভাবতেন। জীবন নিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি সুখী মানুষ। আমার জীবন নিয়ে কোনো অনুতাপ নাই, কোনো অভিযোগ নাই, না পাওয়ার ক্ষোভ নাই, কারও প্রতি ধিক্কার, রাগ নাই। জীবনটা আমার কাছে একটি পুরস্কার।’ সূত্র: দেশটিভির সাক্ষাৎকার