পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (মিটফোর্ড হাসপাতাল) সামনে ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ (৩৯) হত্যা মামলায় পুলিশ অভিযোগপত্র দিয়েছে। তবে আদালতের নির্দেশ পাঁচ মাস পার হলেও এখনও সংশোধিত অভিযোগপত্র জমা হয়নি। পরিবার অভিযোগ করে বলছে, ‘অদৃশ্য শক্তির’ প্রভাবে বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে এবং পলাতক আসামিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে হুমকি দিচ্ছেন।
গত বছরের ৯ জুলাই মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ব্যস্ত সড়কে প্রকাশ্যে লাল চাঁদকে হত্যা করা হয়। হাসপাতালের কাছেই রজনী বোস লেনে ভাঙারির ব্যবসা করতেন তিনি। পিটিয়ে, ইট–পাথরের খণ্ড দিয়ে আঘাত করে তাঁর মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ থেঁতলে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাঁকে বিবস্ত্র করা হয়। তাঁর শরীরের ওপর উঠে হত্যাকারীদের লাফাতে দেখা যায় সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে। পরদিন ১০ জুলাই নিহতের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১৯ জনকে আসামি করা হয়।
তদন্ত শেষে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর কোতোয়ালি থানার তৎকালীন ওসি মো. মনিরুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। আদালত নথি পর্যালোচনা করে কিছু বানান ভুল সংশোধনের নির্দেশ দেন। এরপর মনিরুজ্জামান শাহবাগ থানায় বদলি হন এবং মামলার দায়িত্ব পান নতুন ওসি শাহ মো. ফয়সাল আহমেদ।
অভিযোগপত্রে কিছু শব্দের বানান সংশোধন করতে বলেন আদালত। এ জন্য চারবার সময় চেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। থমকে আছে বিচারকাজ।
লাল চাঁদের পরিবার বলছে, ভুলগুলো সামান্য—কিছু শব্দে আ–কার, ই–কার সংশোধন করতে বলা হয়েছে। কিন্তু একের পর এক শুনানির তারিখ চেয়ে পুলিশ সময় নিচ্ছে। অদৃশ্য শক্তির প্রভাবেই এমন হচ্ছে বলে তাঁদের অভিযোগ। গত বছরের ৮ ডিসেম্বর অভিযোগপত্র জমার পাঁচ মাস পেরে গেছে। এ সময় চারবার সংশোধিত অভিযোগপত্র জমার তারিখ পিছিয়েছে। সর্বশেষ ৫ মে জমা দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এক সপ্তাহ সময় চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। আদালত তা মঞ্জুর করেন।
ওসি ফয়সাল আহমেদ বলেন, অভিযোগপত্রে কিছু সংশোধনী ছিল। আদালতের নির্দেশেই তা সংশোধন হচ্ছে। দ্রুতই অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে। অভিযোগপত্রে হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ২১ জনকে আসামি করা হয়। ভাঙারির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করাসহ এলাকার আধিপত্য নিয়ে আসামি মাহমুদ হাসান মহিন ও সরোয়ার হোসেন টিটুর সঙ্গে বিরোধের কারণে লাল চাঁদকে হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ আছে। ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা না থাকায় ১০ আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। তাড়াহুড়োয় অভিযোগপত্র জমা দেওয়ায় কিছু ভুল (ক্ল্যারিক্যাল মিসটেক) থেকে যায় বলে ওসি মনিরুজ্জামান উল্লেখ করেন। তিনি এখন শাহবাগ থানায় আছেন এবং পরবর্তী বিলম্বের কথা বলতে পারেন না।
হত্যায় নেতৃত্ব দেন টিটু-মহিন। অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন মাহমুদ হাসান মহিন, সারোয়ার হোসেন টিটু, মঙ্গল মিয়া ওরফে মনির হোসেন, আলমগীর, মনির ওরফে লম্বা মনির, নান্নু ওরফে নান্নু কাজী, সজিব ওরফে সজিব ব্যাপারী, টিটন গাজী, তারেক রহমান রবিন, অপু দাস, রিজওয়ান উদ্দিন ওরফে অভিজিৎ বসু ওরফে অভি, জহিরুল ইসলাম, মো. পারভেজ, সাগর, রুমান ব্যাপারী, আবির হোসেন, মো. জহির ওরফে জলিল, মো. ইমরান, শারাফাত ওরফে শফিউল ইসলাম, হোসেন চৌকিদার, জিয়াউদ্দিন রাজিব। এদের মধ্যে ৮ জন পলাতক: সারোয়ার হোসেন টিটু, মো. জহির ওরফে জলিল, মো. ইমরান, মো. শারাফাত ওরফে শফিউল, মো. জিয়াউদ্দিন রাজিব, হোসেন চৌকিদার, মনির ওরফে লম্বা মনির ও অপু দাস।
ভাঙারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মহিন চকবাজার থানা যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, তারেক রহমান রবিন ৩০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সরোয়ার হোসেন টিটু চকবাজার থানা যুবদলের সাবেক সদস্য, অপু দাস চকবাজার থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব ছিলেন। অপু দাসকে ঘটনার পর আজীবন বহিষ্কার করা হয়। এ ঘটনার আগে থেকেই তাঁদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল।
ঘটনায় জড়িত থাকার সাক্ষ্য না পাওয়ায় রাজিব ব্যাপারী, সাবা করিম লাকী, কালু ওরফে স্বেচ্ছাসেবক কালু, রজব আলী পিন্টু, সিরাজুল ইসলাম, হিম্মত আলী, আনিসুর রহমান হাওলাদার, মিজান, মো. নাঈম ও রিয়াদকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। এদের মধ্যে রজব আলী যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহকারী জলবায়ুবিষয়ক সম্পাদক এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক, সাবাহ করিম লাকী। কালু ওরফে স্বেচ্ছাসেবক কালু স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী। গত বছরের ১১ জুলাই তাঁদের সংগঠন থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সোহাগ হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও নেতৃত্ব দেন মহিন ও সারোয়ার। তাঁরা ঘটনাস্থলে সার্বক্ষণিক নির্দেশ দেন। হত্যার পর মৃতদেহের চারপাশে ঘুরে অনুসারীদের নিয়ে স্লোগান দেন। মনির ওরফে ছোট মনির মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর সোহাগের বুকের ওপর লাফিয়ে দুই হাত তুলে উল্লাস করেন।
পরিবারের অভিযোগ, পলাতক আসামিরা চাপ প্রয়োগ করছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়। মাঝেমধ্যে রজনী বোস লেনে যাওয়া-আসা করছেন এবং মামলা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে হুমকি দিচ্ছেন। মামলার বাদী মঞ্জুয়ারা বেগমের মেয়ে বীথি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সারোয়ার হোসেন টিটু মেসেঞ্জারে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। হুমকিতে তাঁরা বলেছেন, বাড়াবাড়ি করিস না। একটা হত্যা আর একাধিক হত্যার সাজা কিন্তু একই।’
সামান্য বানান ঠিক করতেই পাঁচ মাস পেরিয়ে যাওয়ায় মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, ‘কেন এমন হচ্ছে জানি না। ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে এখন সন্দেহ প্রকাশ করছি।’






