রাজধানীর আগারগাঁওয়ের কুমিল্লা বস্তিতে বাস করেন ৮০ বছরের সালেহা বেগম। জীবনভর অভাবের সঙ্গে লড়াই করে এসেছেন তিনি, কিন্তু অভাব এখনও ঘোচেনি। দুই দশক আগে স্বামী মারা যান। এখন মেয়ের সঙ্গে বস্তির একটি ছোট কক্ষে ভাড়া থাকেন। বয়সের কারণে কাজ করতে পারেন না। মানুষের কাছে ভিক্ষা করে যা পান, তাই দিয়ে দিন চলে।

গতকাল সোমবার সকালে আগারগাঁওয়ে টিসিবির ট্রাক সেলে সাশ্রয়ী পণ্য কিনতে নারীদের সারিতে দাঁড়িয়েছিলেন সালেহা বেগম। সকাল ১০টার দিকে সারিতে যোগ দেন তিনি, ছিলেন ৬ নম্বরে। কিন্তু পণ্য হাতে পেতে অপেক্ষা করতে হয় আড়াই ঘণ্টারও বেশি। ট্রাক সেল উদ্বোধনের সময় ছিল বেলা ১১টা। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা দেরিতে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে দুপুর সোয়া ১২টার পর সারির লোকজনের কাছে পণ্য বিক্রি শুরু হয়।

সালেহা বেগমের গ্রামের বাড়ি রংপুরের পীরগাছা উপজেলায়। ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর স্বামী মহির উদ্দিনকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। তারপর আর গ্রামে ফেরা হয়নি। স্বামী এক চোখে দেখতে পেতেন না। ঢাকায় এসে চেয়ে-চিন্তে চলতেন। আর সালেহা বেগম দিনমজুরি করতেন।

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে গতকাল থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে ট্রাকে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম শুরু করেছে টিসিবি বা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ। ট্রাক সেল থেকে একজন ব্যক্তি এক কেজি চিনি, দুই কেজি মসুর ডাল ও দুই লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেল কিনতে পারেন।

সালেহা বেগম বলেন, ‘মাইনসের কাছে চাইয়া-মাইগা খাই। হাত পাইতা ভিক্ষা করি। স্বামী নাই। সরকার কত মাইনসেরে কত কিছু দেয়—বয়স্ক ভাতা দেয়, প্রতিবন্ধী ভাতা দেয়। এহন হুনছি ফ্যামিলি কার্ডও দেয়। আমি কিচ্ছু পাই না।’

টিসিবির ট্রাক সেল থেকে কী কিনেছেন জানতে চাইলে সালেহা বেগম জানান, অনেক কষ্টে কিছু টাকা জমিয়েছিলেন। তাতে ৩৪০ টাকা হাতে ছিল। সকালে ছেলের কাছ থেকে ২০০ টাকা নিয়ে সব মিলিয়ে হাতে ছিল ৫৪০ টাকা। এর মধ্যে ৪৮০ টাকা দিয়ে সয়াবিন তেল, মসুর ডাল ও চিনি কিনেছেন।

এসব পণ্য কতদিন চলবে প্রশ্নে হিসাব করে বললেন, ‘দুই লিটার তেল দিয়া ১৫-২০ দিন যাইতে পারে। আর মসুর ডাল দুইজনে ১০-১২ বার রান্না করা যাইব। চিনি অনেক দিন যাইব।’ চিনি বেশি দিন কীভাবে যাবে জিজ্ঞাসায় হেসে বলেন, ‘আমরা চা খাই না। তাই চিনি রোজ লাগবো না। ঈদের সময় এই চিনি দিয়া সেমাই-পায়েস রানমু। অভাবের সংসারে মাংস তো আর খাওয়া হইব না।’

তাঁর ছেলে ও ছেলের বউও আলাদা সারিতে দাঁড়িয়েছিলেন টিসিবির পণ্য কিনতে। পরে কথা হয় ছেলে শাহদাত হোসেন ও পুত্রবধূ রেশমা বেগমের সঙ্গে। মহির উদ্দিন-সালেহা বেগম দম্পতির তিন ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে শাহদাত সবার ছোট। অভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনোর আগেই কাজ শুরু করেন। এখন ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান। শাহদাতের স্ত্রী রেশমা বেগমও শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। ছোটবেলায় চোখে চুন পড়ে যাওয়ায় বাঁ চোখে কম দেখেন। চিকিৎসা সত্ত্বেও দৃষ্টি পুরোপুরি ফেরেনি।

শাহদাত বলেন, বস্তিতে দুই হাজার টাকা ভাড়ার একটি কক্ষে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকেন। পাশের ছোট কক্ষে থাকেন মা সালেহা বেগম ও ছোট বোন জাহানারা বেগম। জাহানারা আগারগাঁওয়ের এক সরকারি দপ্তরে দৈনিক মজুরিভিত্তিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী। মূলত বোনই মায়ের দেখভাল করেন। ‘আমার একার আয় দিয়া তো নিজের সংসারই ঠিকমতো চলে না। তা–ও আজকে সকালে মাকে ২০০ টাকা দিলাম।’ পুরুষদের সারিতে তিনি ১০ জনের পেছনে ছিলেন। স্ত্রী রেশমা নারীদের সারির ৯ নম্বরে।

বৃষ্টিতে ভিজে সারিতে দাঁড়িয়েই লোকজন পণ্য কেনেন। দীর্ঘ সারি না থাকার পাশাপাশি বৃষ্টির কারণে শেষের দিকে কেউ কেউ একাধিকবার সারিতে দাঁড়িয়ে পণ্য কেনেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে বেলা দুইটার দিকে বিক্রি শেষ করে পরিবেশকের প্রতিনিধিরা চলে যান।

আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে গতকাল থেকে টিসিবি সারা দেশে সাশ্রয়ী মূল্যে ট্রাক সেল শুরু করেছে। প্রতি কেজি চিনি ৮০ টাকা, মসুর ডাল ১৪০ টাকা, দুই লিটার সয়াবিন তেল ২৬০ টাকা। তিনটি পণ্যের প্যাকেজ ৪৮০ টাকা। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, খুচরা বাজারে দুই লিটার সয়াবিন তেল ৩৯০ টাকা, মসুর ডাল প্রতি কেজি ৯০-১১৫ টাকা, চিনি ১০৫-১১০ টাকা। সর্বনিম্ন দাম ধরলেও বাজার থেকে কিনতে লাগত ৬৭৫ টাকা। ট্রাক সেলে সীমিত আয়ের মানুষ ১৯৫ টাকা কমে কিনতে পারছেন।

গতকাল আগারগাঁওয়ে প্রথম দিন নারীদের সারিতে ১৭ জন, পুরুষদের ২৩ জন ছিল। টিসিবির প্রতিনিধিরা হাতে কলমে সিরিয়াল দিয়ে বিশৃঙ্খলা এড়ান। বিক্রি শুরুর ১৫-২০ মিনিট পর বৃষ্টি হয়। বৃষ্টিতে ভিজেও সারিতে দাঁড়িয়ে কিনেছেন সবাই। বেলা দুইটার দিকে বিক্রি শেষ হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী আবদুল মুক্তাদির বলেন, গত বছরের রমজানে টিসিবির মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে প্রায় ২২ লাখ ৮ হাজার টন খাদ্যপণ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। এ বছর সেই পরিমাণ বাড়িয়ে ২৮ লাখ টন পণ্য সরবরাহ করা হয়। গত বছর ঈদুল আজহায় ১০ হাজার ৯০০ টন বিক্রি হয়েছিল। এবার ১৪ হাজার টনের উদ্যোগ। প্রয়োজনে ভবিষ্যতেও ট্রাক সেল চালু রাখা হবে। ঈদ বা বিশেষ সময়ে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় এ উদ্যোগ নেওয়া হবে। নতুন স্বচ্ছ পদ্ধতিতে উপকারভোগী ৮০ লাখে উন্নীত, আরও ২০ লাখ যুক্ত করা চলছে। বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব নিয়ে হতাশা রয়েছে। সরকার পরিকল্পিতভাবে এ পরিবর্তন করছে যাতে বাজার কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।

অনুষ্ঠানে বাণিজ্যসচিব আবদুর রহিম ও টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ উপস্থিত ছিলেন। আগামী ১০ দিন চলবে ট্রাক সেল। সারা দেশে ৭২০টি ট্রাকে পণ্য বিক্রি। ঢাকায় ৫০টি, চট্টগ্রামে ২০টি, অন্য ছয় বিভাগে ১৫টি করে, বাকি ৫৬ জেলায় ১০টি করে। প্রতিদিন প্রতি ট্রাক থেকে গড়ে ৪০০ জন কিনবেন। ১০ দিনে ২৮ লাখ ৮০ হাজার উপকারভোগীর কাছে ১৩ হাজার ৯৩৯ টন পণ্য পৌঁছাবে। ট্রাক সেলের পাশাপাশি স্মার্ট কার্ডধারী পরিবারেও পণ্য বিক্রি হবে।