বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা সম্ভাবনাময় তরুণদের নিয়ে প্রতি বৈশাখেই বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে মুক্তকণ্ঠর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দেও ক্রীড়া, অভিনয়, সংগীত, ব্যবসা, গবেষণায় অগ্রগামী ৭ তরুণকে নিয়ে হাজির হয়েছে। এখানে পড়ুন গায়ক তানভীর ইভানের গল্প।
ডিজিটাল যুগে সংগীতের জনপ্রিয়তা এখন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল। স্পটিফাইয়ে বাংলাদেশের ‘টপ আর্টিস্ট’ হিসেবে ধারাবাহিক স্বীকৃতি পেয়েছেন চট্টগ্রামের তরুণ গায়ক তানভীর ইভান। ১৮০ দেশের ২২ লাখ শ্রোতা এবং গানের কোটি কোটি স্ট্রিম—এই অর্জনের পিছনে রয়েছে এক নিভৃতচারী শিল্পীর নীরব অগ্রসর হওয়া।
স্পটিফাইয়ে তানভীর ইভানের গান ভারতের শ্রোতারাই বেশি শোনেন, বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। প্রথম দশ দেশের তালিকায় রয়েছে পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, নেপাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুর। ইউটিউবে তাঁর চ্যানেলে ৩৩ লাখ সাবস্ক্রাইবার, যেখানে ৫০টি গাওয়া গানের ২৪৮ ধরনের কনটেন্ট রয়েছে। এসব কনটেন্টের বেশিরভাগের ভিউ মিলিয়ন মিলিয়ন।
চট্টগ্রামের তানভীর ইভান নিজের ঘরে গড়া স্টুডিওতে বসে গান বানান, লেখেন, সুর করেন। বিশ্বের নানা প্রান্তে পৌঁছে যায় সেই গান, কখনো বাঙালি শ্রোতা, কখনো আবার ভিনভাষী শ্রোতার কাছে।
এই যাত্রা সহজ ছিল না। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে পড়ার সময় নিজের লেখা ও সুরে ‘ম্যায়নে রোয়া’ গানটি তৈরি করেছিলেন ইভান। গত বুধবার পর্যন্ত গানটির ভিউ প্রায় ৩০ কোটি। ২০১৭ সালে নতুন করে গানটি আপলোড করার পর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। পরের বছর স্পটিফাইয়ে যুক্ত হওয়া। এখান থেকেই তিনি বুঝতে পারেন, গান ভাষার সীমানা ছাড়িয়ে অন্য দেশের মানুষের মনেও জায়গা করে নিতে পারে।
তাঁর যাত্রা শুধু একটি গানের সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। ‘অভিযোগ’, ‘অভিমান’, ‘ছেড়ে যেয়ো না’, ‘আয়না’, ‘শূন্য’, ‘বৃষ্টি’, ‘সাগর পাড়ে দাঁড়িয়ে’, ‘তুম বিন’, ‘আকাশ’—প্রতিটি গান যেন একেকটি অনুভূতির গল্প। এর মধ্যে ‘অভিমান’ গানটি মেরিল–মুক্তকণ্ঠ তারকা জরিপে তাঁকে এনে দেয় সেরা গায়কের স্বীকৃতি।
তানভীর ইভানের সংগীতের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর অনুভূতি। তাঁর গানের কথায় বারবার খুঁজে পাওয়া যায় না–পাওয়ার বেদনা, অপূর্ণতা, একাকিত্ব। কিন্তু সেটি আর শুধু ব্যক্তিগত কষ্টের গল্প হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে সবার গল্প।
গান প্রকাশে তিনি পরিমিত। সংখ্যার চেয়ে নিজের ভালো লাগাকেই প্রাধান্য দেন। ১৩ বছরের সংগীতজীবনে নিজের গাওয়া গানের সংখ্যা ৫০টির বেশি হবে না। কম গান, কিন্তু প্রতিটিতে অনুভূতির গল্প। ফলে প্রতিটি গানের জন্য থাকে অপেক্ষা, আলোচনা এবং মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ।
স্টেজ শো করেন হাতে গোনা, বছরে ৩–৪টি। ঢাকাকেন্দ্রিক সংগীতের আড্ডা বা সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি নেই বললেই চলে। মাঝে কয়েক মাসের জন্য ঢাকায় এসেছিলেন, এরপর আবার ফিরে যান চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের খুলশীর বাড়িতে নিজের স্টুডিও আর কাছের মানুষ—এই ছোট পরিসরেই তাঁর বড় স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়া। তিনি প্রমাণ করেছেন, শিল্পী হওয়ার জন্য ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
তানভীর ইভানের বাবা ইমতিয়াজ বাবুল বাংলাদেশ রেলওয়ে চট্টগ্রামের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা। মা গৃহিণী, দুই বোন চিকিৎসক। নিজে পড়াশোনা করেছেন কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে। স্নাতকোত্তর করার আগেই গানকে পেশা বেছে নেন। বাবা নিজেও গান গাইতেন। ছোটবেলায় বাবাকে মঞ্চে গাইতে দেখে যে স্বপ্ন জন্মেছিল, সেটিই আজ বাস্তব। ইভানের গাওয়া ‘বাবা তুমি আমার বেঁচে থাকার কারণ’ গানটি শুনে কেঁদেছিলেন তাঁর বাবা-মা।
সংগীতে প্রথাগত কোনো তালিম নেননি ইভান। নিজের চেষ্টায়, শুনে শুনে, বিশেষ করে আতিফ আসলামের গান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। সঙ্গে ছিল বাবার দিকনির্দেশনা। তিনি দেখিয়েছেন—নিজের মতো করে, নিজের জায়গা থেকে, নিজের চেষ্টায় ও আগ্রহে বৈশ্বিক স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব।






