অবসরের পর জীবন কীভাবে চলবে—এ কথা মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবীদের মনে সবসময় উদ্বেগ জাগায়। সরকারি পেনশনের আওতায় না পড়া বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও পেনশনভিত্তিক বিমা পণ্যের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। ১৯৫৫ সাল থেকে এ অঞ্চলে কার্যক্রম চালিয়ে আসা মেটলাইফ বাংলাদেশ এ ধরনের পণ্য অফার করছে। ১০ থেকে ২০ বছর মেয়াদির এই বিমার নাম ‘লাইফলাইন’।
এই বিমা থেকে আজীবন, এমনকি ১০০ বছর বয়স হলেও সুবিধা পাওয়া যায়। ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী যেকোনো ব্যক্তি ‘লাইফলাইন’ পণ্যের গ্রাহক হতে পারেন। পলিসির পরিমাণ ১ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। প্রিমিয়াম দেওয়ার সুযোগ আছে মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষাণ্মাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে। মোট জমা টাকার বিপরীতে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নেওয়া যায়।
‘লাইফলাইন’ মূলত অবসরভিত্তিক জীবনবিমা পণ্য। মেটলাইফ এর জন্য দুটি স্লোগান ঠিক করেছে: ‘কর্মক্ষম খাতকেই করুন অবসরজীবনের পরিকল্পনা’ এবং ‘অবসরজীবনেও সুখে থাকুন এখন যেমনটি আছেন।’
লাইফলাইনে গ্রাহক নির্দিষ্ট সময় প্রিমিয়াম জমা দেন। তারপর নির্ধারিত বয়স বা মেয়াদ শেষে মাসিক বা বার্ষিক পেনশন পান। মেটলাইফের তথ্য অনুযায়ী, এই পণ্যে সঞ্চয় ও বিমা সুরক্ষা একসঙ্গে রয়েছে। অর্থাৎ পলিসি চলাকালে গ্রাহকের মৃত্যু হলে নমিনি নির্দিষ্ট বিমা সুবিধা পান। মেয়াদ পূর্ণ হলে গ্রাহক নিজে নিয়মিত পেনশন তোলেন।
প্রিমিয়াম নির্ধারিত হয় পলিসির মেয়াদ, গ্রাহকের বয়স ও কাঙ্ক্ষিত পেনশনের পরিমাণ অনুসারে। এর সঙ্গে হাসপাতাল কেয়ার, ক্রিটিক্যাল কেয়ার, দুর্ঘটনা বিমা বা প্রিমিয়াম ছাড়ের মতো অতিরিক্ত সুবিধা যুক্ত করা যায়। এসব যুক্ত হলে প্রিমিয়াম বাড়ে। বোনাস কোম্পানির আর্থিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
দেশে সরকারি চাকরির বাইরে থাকা মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। তাদের জন্য সরকার সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করেছে। বেসরকারি আর্থিক খাতেও বিমা কোম্পানিগুলো পেনশন সুবিধা দিচ্ছে। তবে বেসরকারি চাকরিজীবীদের বড় অংশের জন্য বাধ্যতামূলক পেনশন নেই। ফলে নিজেদের উদ্যোগে এ ব্যবস্থা নিতে হয়।
দেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়েছে। এসব কারণে মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী, প্রবাসী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে এ ধরনের পেনশন পণ্যের প্রয়োজন বেড়েছে। চাহিদাও বাড়ছে। কর ছাড়ের সুবিধা অনেককে আকর্ষণ করছে। ব্যাংকাস্যুরেন্স চালুর পর ব্যাংকের মাধ্যমে বিক্রিও বেড়েছে।
তবে লাইফলাইনসহ দীর্ঘমেয়াদি বিমা নিয়ে গ্রাহকদের প্রধান প্রশ্ন, এতে কত মুনাফা। অনেকে এটাকে ব্যাংকের ডিপিএস বা এফডির সঙ্গে তুলনা করেন। কিন্তু বিমা ও ডিপিএস/এফডির উদ্দেশ্য আলাদা। বিমা ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেয়, তাই মুনাফাও আলাদা।
কিছু গ্রাহক অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন প্রিমিয়াম দেওয়ার পর প্রত্যাশিত অর্থ পাওয়া যায় না। কেউ বলেন, বোনাস ও মুনাফা নিয়ে শুরুতে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয় না। কেউ দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি ও সেবার প্রশংসা করেন, আবার কেউ বিলম্ব, কাগজপত্রের জটিলতা বা কম রিটার্ন নিয়ে হতাশ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দীর্ঘমেয়াদি দায়। এ পলিসিতে বহু বছর নিয়মিত প্রিমিয়াম দিতে হয়। মাঝপথে বন্ধ করলে আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি। আয় অনিশ্চিত ব্যক্তিদের জন্য এটি কঠিন। উচ্চ মূল্যস্ফীতিও চিন্তার। তবু অপ্রত্যাশিত ঝুঁকি থেকে সুরক্ষায় বিমার প্রয়োজন আছে। বিমাকে মুনাফার পরিবর্তে ঝুঁকি সুরক্ষার দিক থেকে বিবেচনা করলে বিভ্রান্তি কমবে।
এ পলিসি নেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। প্রথমত, মোট কত বছর প্রিমিয়াম দিতে হবে এবং তা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা আছে কি না। দ্বিতীয়ত, নিশ্চিত মুনাফা কত। এছাড়া পলিসি ভাঙলে কত ফেরত, মৃত্যু সুবিধা কত, অতিরিক্ত সুবিধায় প্রিমিয়াম কত বাড়বে, মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় রিটার্ন কত—এসব যাচাই করতে হবে।
শুধু এজেন্টের কথায় ভরসা না করে কাগজপত্র পড়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। সঙ্গে সঞ্চয়পত্র, মিউচুয়াল ফান্ড, পেনশন স্কিম বা ব্যাংক আমানতের সঙ্গে তুলনাও করা দরকার।






