১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করার সেই ক্ষণ রবার্তো বাজ্জোর মনে এখনো তাজা। নীল জার্সি গায়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিষণ্ন মুখের ছবি চোখের সামনে ভাসে। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সেই বলটি যেন আকাশে ঝুলে আছে, আর বাজ্জো সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন।
সম্প্রতি তাঁর নতুন বই ‘লাইট ইন দ্য ডার্কনেস’-এর প্রকাশনা উপলক্ষে ইতালির সংবাদমাধ্যম ‘কোরেইরে দেল্লা সেরা’কে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এই কিংবদন্তি। সেখানে উঠে এসেছে সেই অভিশপ্ত পেনাল্টি, চোটের সঙ্গে লড়াই এবং আধ্যাত্মিক জীবনের গল্প।
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই বাজ্জো স্বীকার করলেন, সেই মুহূর্তটি আজও তাঁর ঘুমের মধ্যে হানা দেয়। বাজ্জো বলেন, “পুরো ইতালির মানুষের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে করেছিলাম। মনে হয়েছিল কোথাও অদৃশ্য হয়ে যাই। এটা ছিল ভীষণ লজ্জার, এমন এক ঘটনা যা সারা জীবনের জন্য স্থায়ী হয়ে গেছে।”
বছরের পর বছর পার হলেও সেই বলটা যেন এখনো কোথাও ঝুলে আছে। বাজ্জোর ভাষায়, “কখনো কখনো হুট করে ঘুম ভেঙে যায়, মনে হয় আমি গোল করেছি...তারপর আবার বাস্তবে ফিরে আসি।” মাঝরাতে ঘুম ভেঙে হয়তো আজও সেই ক্রসবার খুঁজে বেড়ান তিনি।
তবে বাজ্জোর ক্যারিয়ার শুধু এক পেনাল্টি মিসের গল্প নয়, এটি এক অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের গল্প। ১৯৮৫ সালে ফিওরেন্তিনায় যোগ দেওয়ার পরই ছিঁড়ে যায় তাঁর ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট। পরিবারের পুরোনো ফোর্ড গাড়িতে ১২ ঘণ্টার যাত্রার কথা মনে করে বাজ্জো বলেন, “যাত্রাজুড়ে শুধু একটাই ভয় ছিল—আমি কি আর কখনো ফুটবল খেলতে পারব?”
অস্ত্রোপচারের পরের অভিজ্ঞতা ছিল আরও ভয়াবহ। তখনকার চিকিৎসাব্যবস্থা আজকের মতো আধুনিক ছিল না। টিবিয়ায় ছিদ্র করে ২০০টি সেলাই দেওয়া হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর জ্ঞান ফিরতেই যন্ত্রণায় চিৎকার করছিলেন তিনি। বাজ্জো বলেন, “অ্যানেসথেশিয়ার ঘোর কাটতেই যন্ত্রণায় চিৎকার করছিলাম। ব্যথানাশকও নিতে পারছিলাম না। আমি মাকে বলেছিলাম—তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো, তবে আমাকে মেরে ফেলো।”
কিন্তু সেই যন্ত্রণাই তাঁকে ইস্পাত-কঠিন করে তুলেছিল। ইনজুরির কারণে খেলতে না পারায় ক্লাবের বেতনের চেক পর্যন্ত নিতে চাননি তিনি। আত্মমর্যাদা ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে বড়।
বারবার ভেঙে পড়েও উঠে দাঁড়ানোর রহস্য বাজ্জো পেয়েছেন তাঁর আধ্যাত্মিক বিশ্বাস থেকে। বৌদ্ধধর্মের দর্শন তাঁকে নতুনভাবে চিনতে শিখিয়েছে। তিনি বলেন, “বৌদ্ধধর্মই ছিল আমার আশ্রয়। সবচেয়ে কঠিন সময়ে এটা আমাকে শক্তি দিয়েছে, আর কখনো হার না মানার সাহস জুগিয়েছে।”






