দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার রনগাঁও ইউনিয়নের চণ্ডীপুর গ্রামের বাসিন্দা জুলেখা খাতুন (৫৫) গত শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাপের কামড়ে আহত হন। স্বজনরা তাঁকে দ্রুত বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর রক্ত পরীক্ষা করা হয় এবং সাপটিও চিকিৎসকদের কাছে আনা হয়। হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম মজুত থাকলেও তাঁকে ভ্যাকসিন না দিয়ে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানেও অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়নি এবং বেলা সোয়া দুইটার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।

জুলেখা খাতুন রফিকুল ইসলামের স্ত্রী। স্বজনদের অভিযোগ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনম থাকা সত্ত্বেও তাঁকে না দিয়ে রেফার করা হয়েছে। দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ বেড না পাওয়ায় ভর্তি করা সম্ভব হয়নি। দুই হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্সদের অবহেলায় জুলেখার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্বজনেরা।

আজ রোববার সকালে জুলেখা বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিবেশী ও স্বজনেরা ভিড় করেছেন। মায়ের মৃত্যুশোকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ছোট মেয়ে সুমী আক্তার (২৩)। তিনি জানান, দুপুর সাড়ে ১২টায় গোলাঘর থেকে তাঁর মায়ের চিৎকার শুনতে পান। এসে দেখেন বাঁ হাত থেকে রক্ত ঝরছে, ব্যথায় কাতরাচ্ছেন মা। তাঁর চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। পরে তাঁর ভাই মোটরসাইকেলে করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

জুলেখার ছেলে আবদুল হান্নান বলেন, ‘হাসপাতালে রক্ত পরীক্ষা করে জানায়, ভ্যাকসিন আছে। কিন্তু আইসিইউ নেই। ভ্যাকসিন দিলে আইসিইউ সাপোর্ট লাগবে। আমরা ভ্যাকসিন দিতে বলি। কিন্তু উনারা (চিকিৎসকেরা) ভ্যাকসিন না দিয়ে আমাদের দিনাজপুর মেডিকেলে রেফার করেন। এখানে এসে জরুরি বিভাগে ভর্তি করালাম। নার্সরা বললেন, “আইসিইউ বেড ফাঁকা নাই। আপনারা জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন, না হলে চেক আপ স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিয়া যান।” ততক্ষণে মায়ের মুখ দিয়ে ফেনা বের হওয়া শুরু হয়েছে। চেকআপ হাসপাতালে নিয়ে এলে চিকিৎসক মাকে মৃত ঘোষণ করেন।’

বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বিজয় কুমার রায় মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘হাসপাতালে বর্তমানে ৪০ ভায়েল অ্যান্টিভেনম আছে। হাসপাতালে ওই রোগীর রক্ত পরীক্ষাও করা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে হেমোটক্সিক এবং নিউরোটক্সিক কোনো সংক্রমণ পাওয়া যায়নি। স্বজনদের আমরা বলেছিলাম যে এ ধরনের রোগীকে ভ্যাকসিন দেওয়ার পর আইসিইউ সাপোর্ট দরকার হয়, যেটা উপজেলায় নেই। পরে তাঁরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে জানতে পারি, রোগীর মৃত্যু হয়েছে।’

চিকিৎসায় অবহেলার বিষয়ে বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ হাসান মুঠোফোনে বলেন, ‘সাপের কামড়ে একজন রোগীর মারা যাওয়ার ঘটনা জেনেছি। কিছুদিন আগে এডিবির বরাদ্দ থেকে হাসপাতালে ২০ ভায়েল অ্যান্টিভেনম কিনে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রোগীকে ভ্যাকসিন সরবরাহ না করার কারণ কী, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’

দিনাজপুরের বিভিন্ন উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত এক বছরে সাপের কামড়ে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে সাপের কামড়ে মৃত্যুর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। জেলা সিভিল সার্জন আসিফ ফেরদৌস বলেন, ‘বর্তমানে অ্যান্টিভেনম মজুত আছে। বোচাগঞ্জের ওই রোগীর মৃত্যু ও ভ্যাকসিন না পাওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সাপে কাটা রোগীর তথ্য সংরক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালগুলোতে হিসাব থাকে। তবে সেভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি হয়তো।’