অভিনয়শিল্পী ফরিদা আক্তার ববিতা ১৯৮৬ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যবসায়ী ইফতেখারুল আলমকে বিয়ে করেন। বিয়ের তিন বছর পর ১৯৮৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তাঁদের সন্তান অনিক ইসলামের জন্ম হয়। অনিকের জন্মের তিন বছর বয়সে মারা যান ববিতার স্বামী। এরপর তাঁর জীবনে অনেকেই আসতে চেয়েছিলেন, পরিবার ও আত্মীয়রাও বিয়ের জন্য চাপ দিয়েছিলেন। কিন্তু সন্তানের কথা ভেবে ববিতা দ্বিতীয়বার সংসার শুরু করেননি। মা দিবসে মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে কথায় তিনি তাঁর সংগ্রামী জীবনের গল্প খুলে বললেন।

ববিতার সিনেমা নিয়ে ছিল স্বপ্ন। স্বামী ইফতেখারুল আলম তাঁকে পুরোপুরি সমর্থন করতেন। বলতেন, ‘বাড়ির কোনো কিছু নিয়ে ভাবতে হবে না তাঁকে, যেন শুধুই সিনেমা নিয়ে ভাবেন।’ ববিতাও সেভাবে জীবন কাটাতেন। স্বামী ও পেশা দুটো সুন্দরভাবে মানিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু এত অল্প সময়ের সংসারজীবন হবে, তা কে জানত। ববিতার মতে, ‘মাত্র ছয় বছরের দাম্পত্য জীবন। হঠাৎ অনিকের বাবার মৃত্যুতে চারদিকে ঘোর অন্ধকার নেমে আসে। কী করব, কীভাবে জীবন চলবে, যেন দিশাহারা আমি। তবে মনোবল হারানোর মানুষ তো আমি নই। মনটাকে শক্ত করি। আমার সন্তান আছে, তাঁকে নিয়েই আমাকে এগিয়ে যেতে হবে। তাঁকে গড়ে তুলতে হবে। আবার আমার ক্যারিয়ার। দুটোকে সমন্বয় করেই এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করি।’

অনিকের বাবা ইফতেখারুল আলম কিডনি, লিভার, হার্টের নানা রোগে ভুগতেন। তবে এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন, তা ববিতা ভাবতে পারেননি। মৃত্যুর পরের সময় অকুলপাথরেও তিনি সামলে নেন। ববিতা বললেন, ‘পরিবারের কেউ আমাকে সারা দিন দেখাশোনা করত না। মাঝেমধ্যে করবে। কারণ, তাদের সবারও তো আলাদা সংসার, পেশাগত জীবন। তাই সব আমাকে একাই করতে হতো। শুটিং, আয়রোজগার, সংসার চালানো, অনিককে দেখাশোনা—সব একাই করতে হতো।’

অনিকের জন্মের আগে ‘লেডি স্মাগলার’ ছবির শুটিংয়ে ফিলিপাইনে যান ববিতা। নিজের প্রযোজনাপ্রতিষ্ঠানের এই ছবির বেশিরভাগ শুটিং হয় সেখানে। অ্যানি সি স্কোভা নামের এক তরুণী প্রোডাকশনে কাজ করতেন। তাঁকে পছন্দ হয় ববিতার, দেশে আনার পরিকল্পনা করেন বাসার কাজে সাহায্যের জন্য। অনিকের জন্মের পর তিনিই তার দেখাশোনা করেন। ববিতা বললেন, ‘ফিলিপাইনে “লেডি স্মাগলার” ছবির শুটিংয়ের সময়ে অ্যানিকে বলেছিলাম, তুমি কি বাংলাদেশে যেতে চাও? তখন কিন্তু অনিকের জন্ম হয়নি। সে বলে কি, আমার তো পাসপোর্ট নেই। তখন বলেছিলাম, আমি পাসপোর্ট করিয়ে নেব। আমি ভাবলাম, আমি একজন শিল্পী মানুষ, শুটিংয়ের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। এমন একজন মানুষ দরকার, যে খুব বিশ্বাসী। তখন বাংলাদেশি, কাজ যারা করত, তাদের ওপর খুব একটা আস্থা রাখা যেত না। নানা ধরনের দুর্ঘটনা ঘটত। আবার তারা ঠিকমতো কাজ করত না। অ্যানিকে আনলাম, মেয়েটা এত বিশ্বাসী ছিল, আমার বাসার সবকিছু সামাল দিত। ঘরসংসার, বাজারসদাই, সব করত। আমার শুটিংয়ের কাজেও সহযোগিতা করত। শুরুতে টানা পাঁচ-ছয় বছর ছিল। এরপর একবার গিয়ে আবার এল। ফিরে এসে আবার পাঁচ-ছয় বছর ছিল। তারপর একদিন মেয়েটা বলল, বাবা-মায়ের বয়স হয়েছে, আমাকে একেবারে চলে যেতে হবে। মেয়েটা চলে গেল। এরপর আবার অন্য মিশন শুরু।’

অনিকের স্কুলজীবন শুরু হয় বনানীর প্লে–পেন স্কুলে। ববিতা বললেন, ‘আমার ড্রাইভার অনিককে স্কুলে দিয়ে আসত। মেয়েটা নিয়ে আসত। ওই মেয়েটা আমি যখন ছবি বানাতাম প্রোডাকশনের কাজও করত। সব কাজ জানত। খুবই স্মার্ট ছিল। বাংলাদেশে তখন বাসাবাড়িতে বিদেশি কাজের লোক রাখা যেত না। আমি তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে একটা চিঠি লিখেছিলাম। লিখেছিলাম, আমি একজন শিল্পী মানুষ, দেশ-বিদেশ নানা জায়গায় শুটিংয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। আমার সন্তানের বাবা বেঁচে নাই। আমার সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে গৃহপরিচারিকা রাখার অনুমতি দিলে ভালো হয়। অনুমতি পাই।’ প্লে–পেন স্কুলে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ার পর অনিক স্কলাস্টিকায় ভর্তি হন। এখান থেকে ও লেভেল ও এ লেভেল শেষ করে কানাডার ওয়াটার লু ইউনিভার্সিটিতে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এখন চাকরি করছেন। ববিতা বললেন, ‘অনিক যখন বনানীর স্কুলে যাওয়া শুরু করে, তখন শুরুর দিকে আমি ওর ক্লাসরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতাম। পরীক্ষায় সময় এটা বেশি করতে হতো। ববিতা নায়িকা, ওসব বিষয়ে আমার মধ্যে কাজ করত না।’

অ্যানি চলে যাওয়ার পর ববিতা আবার চিন্তায় পড়েন। শুটিংয়ের জন্য গৃহপরিচারিকা লাগবে। এবার দেশ থেকে নেন, তবে বাইরে গেলে অনিকের খোঁজাখবর নিয়ে মন পড়ে থাকত। স্বামীর মৃত্যুর পর বিয়ের চাপ আসে পরিবার ও আত্মীয়দের থেকে। অনেকে প্রেমের প্রস্তাবও দেন। কিন্তু অনিকের কথা ভেবে ববিতা বিয়ের কথা ভাবেননি। ববিতা বললেন, ‘আত্মীয়স্বজন আর অভিভাবকেরা বলত, তুমি এত অল্প বয়সে স্বামীহারা হলে, আবার বিয়ে করা উচিত। কারণ, আমি সব মিলিয়ে সংসার করেছি পাঁচ-ছয় বছর। তারপর তো অনিকের বাবা মারাই গেল। আমি বললাম, বিয়ে আমি আর করব না। আমার সন্তান, আমার অভিনয়জীবন—এ নিয়েই আগামী জীবন কাটিয়ে দিতে চাই। সন্তানের দেখাশোনা, শুটিং—একা জীবনে যতটুকু পারি করেছি। তবে ওই সময়টায় সিঙ্গেল মাদার হওয়ার কারণে অনেক স্যাক্রিফাইস করতে হয়েছে। আউটডোর শুটিং পারতপক্ষে করতে পারতাম না। নিতাম না। ভাবতাম, আমি যদি ঢাকায় না থাকি, তাহলে বাসায় যদি কোনো সমস্যা হয়, কীভাবে সামাল দেব। এফডিসিতে থাকলে তো গাড়ি টান দিয়ে বাসায় যেতে পারব। কিন্তু কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মানিকগঞ্জ, সিলেট, গাজীপুরে যদি শুটিংয়ে থাকি, তাহলে তো ছেলের খোঁজখবর নিতে পারব না। এরপরও কতবার যে এমন হয়েছে, আমি শুটিংয়ে যাওয়ার সময় অনিক খুব কাঁদছিল। বলছিল, “আম্মা তুমি যেয়ো না, আম্মা তুমি যেয়ো না।” কিন্তু ছবিগুলো তো আমার সাইন করা। যেতেই হবে। শুটিং না করলে সংসারজীবনই–বা চলবে কী করে। এসব নিয়ে আমার পুরো জীবনটা কেটেছে।’

সিঙ্গেল মাদার হিসেবে জীবন কাটিয়ে বললেন ববিতা, ‘আমার জীবনটা অনেক কঠিন ছিল, আবার শান্তিরও। অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে, কষ্ট স্বীকার করা লাগছে। কিন্তু সবকিছুর পর যখন সন্তানের মুখটা দেখতাম, শান্তিতে মনটা ভরে যেত।’ ও লেভেলের ছাত্র হলে অনিক মায়ের বিয়ের কথা বলে। ববিতা বললেন, ‘অনিক যখন বড় হয়েছে, বুঝতে শিখেছে, তখন আমাকে বলত, “আম্মা তুমি একা। তোমার অনেক কষ্ট হয়। তুমি একটা আব্বু নিয়ে আসো।” আমি সন্তানকে বুঝিয়েছিলাম, “না বাবা, এটা হয় না। তুমি থাকলে আমার কিছুই লাগবে না। তোমাকে নিয়েই তো আমি ভালো আছি।”’

কথায় বললেন ববিতা, ‘সবাই যে এত বলত বিয়ে করো, বিয়ে করো, তখন এটাও ভাবতাম, আমি যদি একটা মানুষকে বিয়ে করি, সেই সংসারে হয়তো সন্তান হবে। আর সন্তান যদি হয়, কেমন হবে, কী হবে? অনিককে মেনে নেবে কি নেবে না। অনিক আবার তাদের সাথে অ্যাডজাস্ট করতে পারবে কি পারবে না, কত কি যে আমার মাথার মধ্যে চলত। কত মানুষ আমাকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। চাইলে বিয়ে করতেই পারতাম, কিন্তু করিনি। আমাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন বিয়ে করেছে, সেটা একান্তই তাঁদের বিষয়। অনেক কিছু ভেবে আর দ্বিতীয়বার বিয়ের কথা ভাবিনি।’ দেশে-বাইরে সবার প্রিয় অভিনেত্রী ববিতা, কিন্তু অনিকের কাছে তিনি ‘সংগ্রামী মা’। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে ২৭৫টি ছবিতে কাজ করেছেন। সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য দেশ-বিদেশে প্রশংসা পান।