যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথ কলেজের পোস্টডক্টরাল রিসার্চ সায়েন্টিস্ট আশফাক আহমেদ মা দিবসে বিশেষ আয়োজনে লিখেছেন।
বাংলাদেশের সাধারণ গৃহিণীদের মতোই আমার আম্মু। তিনি সর্বক্ষণ ঘরের কাজে মগ্ন। ঘরের প্রতিটি কোণে তাঁর নজর, বাজারের তালিকায়, রান্নার সরঞ্জামে এবং সকলের স্বাস্থ্যে। কিন্তু দুটি বিষয়ে আম্মু অন্যদের থেকে আলাদা। প্রথমত, তাঁর অটুট মানসিক শক্তি এবং অবিরাম লেগে থাকা। দ্বিতীয়ত, আমার পড়াশোনা ও গড়ে ওঠায় তাঁর অক্লান্ত চেষ্টা।
আম্মুর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নেই। তবে লেখাপড়ার গুরুত্ব তাঁর মধ্যে যেন গভীরভাবে বাসা বেঁধেছে। এবং এর জন্য তিনি যেভাবে প্রাণপণ পরিশ্রম করেছেন, তা খুব কম মানুষের মধ্যে দেখেছি। এটাই আমাকে ভিতর থেকে গড়ে তুলেছে, আমার চিন্তাধারা গঠনে সাহায্য করেছে।
প্রায় দশক আগের ঘটনা। তখন বাংলাদেশে চিকুনগুনিয়ার মহামারী। আমার ১০১ ডিগ্রি জ্বর, আম্মুর ১০৩। আব্বু ও ছোট ভাইয়েরও তীব্র জ্বর। কিন্তু আমার সেমিস্টার ফাইনাল। সকলে বিছানায় আটকা। তবু আম্মু হাসিমুখে একাই তিনবেলা রান্না, কোটা-বাছাই, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা করে যান। তাঁর মুখে বারবার এক কথা, ‘পরীক্ষায় যেন কোনো অসুবিধা না হয়’। আমি নিশ্চিত, এমন ঘটনা প্রায় সব বাড়িতেই ঘটে। কিন্তু মায়েদের প্রাপ্য ক্রেডিট নিয়ে আমরা তেমন ভাবি না।
আরেক ঘটনা। ২০১৯ সাল। বুয়েট থেকে গ্র্যাজুয়েশন সবে শেষ। চাকরি করিনি, কারণ লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা। তার জন্য জিআরই ও টোয়েফেল দিতে হয়। হাতে টাকা ছিল না। এই পরীক্ষাগুলো ব্যয়বহুল। তখন আম্মুর সঞ্চয়ের প্রায় সবটুকু দিয়ে পরীক্ষা ও ভিসা ফি মিটে। এ ধরনের ছোট ঘটনা ভুলে যাওয়া সহজ। কিন্তু এগুলো না হলে জীবন হয়তো অন্য পথে চলে যেত।
আমার বর্তমান একাডেমিক অবস্থানে আম্মুর অবদান সবচেয়ে বেশি। প্রথম কয়েক বছর আমি গড়পড়তা ছাত্র ছিলাম। কিন্তু শিখেছি, লক্ষ্যে পৌঁছাতে সবচেয়ে মেধাবী হওয়ার দরকার নেই। শুধু সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করা এবং নিজেকে সঠিক জায়গায় রাখা। এখানে আম্মু আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর বুঝেছি। তিনি সবচেয়ে ভালো বিশ্লেষণ করতেন—কোথায় আমার শক্তি, দুর্বলতা, কোন শিক্ষক দরকার, কোন লেখকের বই ভালো হবে। সব ব্যবস্থা করে তিনিই নিশ্চিত করেছেন যেন আমি সেরা ফল পাই।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি শেষ করেছি। আইভি লিগের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ আটটি প্রতিষ্ঠানের একটি ব্রাউন। এখন ডার্টমাউথ কলেজে পোস্টডক্টরাল রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসেবে কাজ করছি, আরেকটি আইভি লিগ বিশ্ববিদ্যালয়। আমার এই অবস্থানকে ভবনের সঙ্গে তুলনা করলে বলব, প্রতিটি ইটের গাঁথুনি আম্মুর দেওয়া। ৩০ বছর ধরে ভোরে উঠে তাঁর দিন শুরুর এই সাজসজ্জা তারই প্রতিফলন।
মা দিবসে সকল মাকে শ্রদ্ধা জানাই, যাঁদের প্রতিদিনের জীবন একেকটি যুদ্ধ। তবু তাঁরা হাসিমুখে যুদ্ধ জয় করেন, পরিবারকে আগলে রাখেন।
আম্মু বলেছিলেন, ‘ভয় পাবি না, আমি ফোনের এপাশে আছি’






