মা দিবসের বিশেষ আয়োজনে টরেন্স ইউনিভার্সিটি অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষার্থী খন্দকার তাসনিম ফেরদৌস নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন।
নীরব ত্যাগ, অফুরান ভালোবাসা এবং অদম্য ধৈর্য নিয়ে আম্মু আমাকে আজকের এই রূপ দিয়েছেন। ছোটবেলা থেকে দেখেছি, তিনি শুধু রেজাল্টের পেছনে ছুটছেন না। বরং বারবার বলতেন, ‘আগে মানুষ হও, পরে সার্টিফিকেট।’ এই কারণেই পড়াশোনার বাইরের জগৎটা হাত ধরে চিনিয়ে দিয়েছেন।
২০১৭ সাল থেকে আম্মু আমাকে ও ছোট ভাইকে নিয়ে নিয়মিত কিশোর আলোর ‘কিআড্ডা’য় যেতেন। সেখানে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হতো। নিজের মতামত প্রকাশ করা, অন্যের কথা শোনার মতো ছোট ছোট অভ্যাসগুলো ধীরে ধীরে আমার ভেতরের জড়তা দূর করেছে। আমি শিখেছি, ভয়কে সরিয়ে সামনে দাঁড়ানো কীভাবে হয়, নিজের চিন্তা গুছিয়ে বলতে হয় কীভাবে। এই অভিজ্ঞতাগুলোই আমার ব্যক্তিত্বের ভিত্তি গড়ে তুলেছে।
জীবন সবসময় সহজ নয়। একসময় পড়াশোনার চাপ, ভেতরের অস্থিরতা—নানা কারণে আমি ভেঙে পড়েছিলাম। চারপাশের দেয়াল যেন চেপে আসছিল। রাতে ঘুম আসত না, সকালে উঠতে ইচ্ছে করত না। আম্মু চুপচাপ পাশে বসতেন। একদিন বললেন, ‘ঝড় চিরদিন থাকে না বাবা। ছাতাটা শক্ত করে ধরো, রোদ উঠবেই।’ কোনো বড় উপদেশ ছিল না, তবু এই কথা আমাকে আবার টেবিলে বসিয়ে দিয়েছিল।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ এমনিতেই সীমিত। শুরুতে আমি বেশ হতাশ ছিলাম। কিন্তু আম্মু ও বন্ধুদের সমর্থন পেয়েছি। তারপর এল জীবনের সবচেয়ে বড় মোড়—অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যাওয়া। এয়ারপোর্টে লাগেজ হাতে দাঁড়িয়ে শেষবার জড়িয়ে ধরার সময় আম্মুর চোখ ছলছল করছিল। কিন্তু মুখে হাসি। তিনি বললেন, ‘ভয় পাবি না, আমি ফোনের এপাশে আছি।’
সিডনিতে প্রথম কয়েক মাস সত্যিই কঠিন ছিল। নতুন শহর, নতুন মানুষ, একা ঘর। প্রতি রাতে আম্মু ফোন করতেন। জিজ্ঞেস করতেন, ‘আজ কী রান্না করলি? ক্লাস কেমন হলো?’ তাঁর গলা শুনলেই মনে হতো আমি একা নই। ধীরে ধীরে এই শহর আমারও হয়ে উঠল।
এখন আমি অস্ট্রেলিয়ার টরেন্স ইউনিভার্সিটিতে কমিউনিটি সার্ভিস নিয়ে পড়ছি। প্রতিটি অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার আগে ভাবি, আম্মু দেখলে কী বলতেন। আমার সব অর্জনের পেছনে একটাই নাম—মাফরুহা খন্দকার। তিনি শুধু আমার মা নন, আমার সাহস, শিকড় এবং সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। জীবন যতবার এলোমেলো হবে, একটা ফোনকল দূরত্বে আমার পৃথিবী ঠিকই দাঁড়িয়ে আছে।






