১৩ বছর আগে লালমাথা ট্রোগনের ছবি তোলার জন্য প্রয়াত বন্য প্রাণী আলোকচিত্রী তানিয়া খানের সঙ্গে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর বিটে পৌঁছাই। কিন্তু ভোর থেকে ঘুরেও সেই পাখিটির দেখা পাইনি। তবে ইতিমধ্যে বেশ কয়েক প্রজাতির পাহাড়ি বনের পাখি দেখতে পেয়েছি। ঠিক বেলা পৌনে ১১টায় হঠাৎ সামনের গাছের ডালে ধূসর পিঠ ও সাদাটে বুকের ছোট্ট একটি ঝুঁটিয়াল পাখি এসে বসল। পাখিটির পালকের রং এখনো পুরোপুরি ফুটেনি, ফ্যাকাশে লাগছে। স্পষ্টতই এর বয়স কম। মাত্র দুটি ক্লিক করতেই সে উড়ে চলে গেল।
তারপর পৌনে ১১ বছর কেটে গেছে। বারবার বিভিন্ন পাহাড়ি বনে গিয়েও পাখিটির সন্ধান পাইনি। অবশেষে ২০২৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর এল সেই সুযোগ। আদমপুর বিটের ছড়া দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মাথার ঠিক ওপরের গাছের ডালে সোনালি ডানা ও ধূসর পিঠের প্রাপ্তবয়স্ক পাখিটির দেখা মেলে। তার পালকের রং কত সুন্দর! কিন্তু ২-৩ সেকেন্ড সময় দিয়েই সে পালিয়ে গেল। ফলে ভালো ছবি তোলা হয়নি।
ঠিক ১৩ মাস পর আবার দেখা হয় চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির হাজারিখিল বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যের পাহাড়ের উঁচু অংশে। তবে অতি লাজুক এই পাখিটি সেগুনগাছের পাতার নিচে কিছুটা অন্ধকারে থাকায় ঝকঝকে ছবি তোলা সম্ভব হয়নি। এবছরের ২৭ মার্চ দুপুরে হাজারিখিলের ছড়ার গহ্বরে এক বাঁশঝাড়ে আবার তার সঙ্গে দেখা। আগের দিন পায়ে ব্যথা নিয়ে কোমরপানি পেরিয়ে অনেক কষ্টে গিয়েও দেখা পাইনি। তাই এবার পানিপথ এড়িয়ে পিচ্ছিল পাহাড়ি পথে সতর্কতার সঙ্গে গেলাম। সঙ্গী বার্ডিংবিডি ট্যুরসের জাবের আনসারি মুঠোফোন থেকে পাখিটির রেকর্ড করা ডাক বাজাতেই বাঁশঝাড়ে তার লাফালাফি শুরু হয়। কিন্তু অন্ধকার ও ডালপালার কারণে ছবি তুলতে কষ্ট হলো। এবারও ভালো ছবি হয়নি। আসলে এর ঝকঝকে ছবি তোলা ভাগ্যের খেলা।
আদমপুর ও হাজারিখিলে দেখা এই পাখিটি বাংলাদেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি ধূসর বুলবুলি। সোনালি-ডানা বুলবুলি (পশ্চিমবঙ্গ) ও কালচে বুলবুল নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম এশি বুলবুল। পিকনোনটিডি গোত্রের এই পাখির বৈজ্ঞানিক নাম Hemixos flavala। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এর দেখা মেলে।
প্রাপ্তবয়স্ক ধূসর বুলবুলির দৈর্ঘ্য ২০ সেন্টিমিটার। ওজন ৩৩ গ্রাম। মাথার ঝুঁটি উষ্কখুষ্ক। মাথা ও মুখ কালচে-ধূসর। চোখের নিচ থেকে ঠোঁট পর্যন্ত একটি তিনকোনা কালো পট্টি। কানঢাকনি ফ্যাকাশে তামাটে-বাদামি। দেহের ওপরটা কালচে-ধূসর। ডানার মধ্যপালক-ঢাকনিজুড়ে জলপাই-সোনালি চওড়া পট্টি। গাল-গলা সাদা। বুক, পেট ও দেহের নিচটা ধূসরাভ-সাদা। লেজ গাঢ় বাদামি-ধূসরাভ। ঠোঁট কালো। চোখ কিছুটা লালচে-বাদামি। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল কালচে-বাদামি। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে বয়স্কগুলোর মতো হলেও ঝুঁটি ছোট। পিঠের বাদামি ভাব বেশি। ডানার পট্টি হালকা সোনালি-হলুদাভ। ঠোঁট হালকা রঙের।
এরা সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনের বাসিন্দা। দিবাচর ও বৃক্ষচারী এই পাখিরা সাধারণত জোড়ায় বা ছোট দলে থাকে। ঝুলন্ত লতাপাতা ও গাছের পত্রগুচ্ছে খাবার খোঁজে। পাকা ফল, ফুলের নির্যাস ও পোকামাকড় খায়। মাঝেমধ্যে পানি পানের জন্য ছড়ার পাথরের ওপর নামে। ডাক বৈচিত্র্যময়; কখনো সংক্ষিপ্ত। কখনো সুরেলা খচখচে স্বরে ভরা।
মে থেকে জুলাই প্রজননকাল। এ সময় মাটি থেকে ২-১২ মিটার উচ্চতায় ঝোপঝাড়ে বা ঝুলন্ত লতাপাতার মধ্যে মরা পাতা, ঘাসের ডাঁটা ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে ছোট্ট চ্যাপটা বাটির মতো বাসা বানায়। স্ত্রী তাতে দুই থেকে পাঁচটি ঘন লালচে-বেগুনি ছিটছোপে ভরা হালকা গোলাপি ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে তা দেয় ও ছানাদের লালনপালন করে। ডিম ফোটে ১২-১৪ দিনে। আয়ুষ্কাল ৫-৮ বছর।
আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ এবং অধ্যাপক, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়






