অভিনেত্রী দিলারা জামান পর্দায় নানা চরিত্রে মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। কিন্তু বাস্তব জীবনে তাঁর মেয়ে হিসেবে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক কেমন, সেটা জানান দিলারার সন্তান জুবায়রা জামান চৌধুরী।
২৬ বছর ধরে আমি দেশের বাইরে বসবাস করছি। এর মধ্যে ২০১৪ সালে আব্বা মারা যান। তাঁর শেষ সময়ে তিনি আমার কাছেই ছিলেন। বারবার বলতেন, ‘তোর মায়ের দায়িত্ব আমি তোকে দিয়ে যেতে চাই।’ আব্বা চলে যাওয়ার পর আম্মা সিদ্ধান্ত নেন আমেরিকায় আর থাকবেন না। গ্রিন কার্ড ত্যাগ করেন। তাঁকে রাখতে পারিনি। তখন নিজেকে খুব ব্যর্থ মনে হয়েছিল। ভেবেছিলাম, আব্বার দেওয়া দায়িত্ব পালন করতে পারিনি।
আম্মাকে আমার মনে হয় অত্যন্ত একগুঁয়ে। কথা শোনেন না। সবার কাছে তিনি অভিনেত্রী দিলারা জামান, একজন সেলিব্রিটি; কিন্তু আমার কাছে তো তিনি মা। এই সম্পর্ক রক্তের বন্ধন, এখানে কোনো স্বার্থ নেই। মেয়ে হিসেবে মন খুলে সব বলতে পারি। তাই রাগ-অভিমানও বেশি হয়।
আম্মার সঙ্গে আমার একটা বড় অভিমানের জায়গা তাঁর পর্দার ছেলেমেয়েরা। নাটকে দেখি, তিনি ছেলেমেয়েদের জড়িয়ে ধরছেন, চুমু খাচ্ছেন। অনেক ভিডিও ভাইরালও হয়। দেখলে আমার মন খারাপ হয়। আম্মার একটা জড়তা আছে। এসব ঘনিষ্ঠতা তিনি আমাদের সঙ্গে করেননি। অনেকে বোঝায়, পর্দায় যা দেখা যায় তা অভিনয়। তবু মনে হয়, আমাদের সঙ্গেও তো ওই ঘনিষ্ঠতা দেখাতে পারতেন। এখন আমি নিজেও মা। আমার মেয়েদের কাছে ভালোবাসা প্রকাশ করি। আম্মার কথা ভাবলে মনে হয়, তাঁদের প্রজন্ম হয়তো ভালোবাসার প্রকাশকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেনি। তারা এতে অভ্যস্ত নয়।
আম্মা খুব ‘স্ট্রিক্ট’ ছিলেন। আমরা দুই বোন—আমি আর বড় আপা তানিরা—দুজনকেই কঠোর শাসনে বড় করেছেন। সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে বাড়ি ফিরতে হতো। বন্ধুদের সঙ্গে দুপুর বা রাতের খাবার খাওয়া, আড্ডা দেওয়া যেত না। বাসায় ছেলে বন্ধু আনা নিষেধ ছিল, এলেও ড্রয়িংরুমে বসা পর্যন্ত অনুমতি। এসব ক্ষেত্রে আব্বাও সমান কঠোর ছিলেন।
আম্মা শিক্ষকতা করতেন। তাঁর স্কুলেই আমাদের ভর্তি করতেন। সবসময় চোখে চোখে রাখতেন। কখনো ক্লাস ফাঁকি দিতে পারিনি। তবে এই কঠোরতায় একটা জিনিস শিখিয়েছেন—সততা। আব্বা বাংলাদেশ টেলিভিশনের পরিচালক (প্রশাসন) ছিলেন। দুজনেই কখনো লোভলালসা করেননি। ফলে আমরা প্রাচুর্যের মধ্যে বড় হয়নি। এই গুণ আমাদের মধ্যেও এসেছে। সব পরিস্থিতিতে সৎ থাকার চেষ্টা করি। মনে রাখি, ওপরে একজন আছেন যিনি দেখছেন।
চট্টগ্রামে আম্মা থিয়েটার করতেন, অরিন্দমে ছিলেন। ঢাকায় আসার পর থিয়েটার পুরো ছেড়ে দেন। জানতেন, থিয়েটারে অনেক সময় লাগে। তখন স্কুল আর বাসার মধ্যে বন্দী। আমাদের স্কুলে আনা-নেওয়া করতেন। রিকশায় আমাকে কোলে নিতেন, বড় আপা পাশে বসত। নিজ হাতে রান্না করতেন। আমরা কখনো গৃহপরিচারকের রান্না খাইনি। বাজারও নিজে করতেন। এ সময় অভিনয় থেকে লম্বা বিরতি নেন।
পরে হুমায়ূন আহমেদের এইসব দিনরাত্রি নাটক দিয়ে অভিনয়ে ফিরে আসেন। তখন তাঁর মধ্যবয়স, মা চরিত্রে অভিনয়ের কথা হয়তো ছিল না। কিন্তু তিনি করেন। তারপর থেকে রাগী, খিটখিটে মায়ের চরিত্র আসতে থাকে। তখন শুধু ওই ধরনের চরিত্রের জন্য বিবেচিত হতেন। এ ‘স্যাক্রিফাইস’ আমাদের জন্য।
মা হতে আম্মার অনেক সময় লেগেছে। বিয়ের ১০ বছর পর মা হন। এজন্য হয়তো মায়েদের প্রতি আলাদা দরদ আছে। ছোটবেলা থেকে দেখতাম, কারও মা হওয়ার খবরে ব্যস্ত হয়ে যেতেন। হাতে টাকা গুঁজে দিতেন। টিফিন ভরে খাবার নিয়ে যেতেন।
আম্মার মাতৃত্বের অনুভূতি গভীর। আমাদের ছোট ভাই আশিক আড়াই বছর থেকে পরিবারের সঙ্গে। আমরা একসঙ্গে বড় হয়েছি। আম্মা তাকে নিজের ছেলের মতো আদর করেন। ২০১৪ সাল থেকে আশিক আম্মার সঙ্গে থাকে।
আম্মা প্রচণ্ড উদার। ১০ টাকা থাকলে ৫ টাকা অন্যের জন্য রাখেন। চোখের অপারেশন, ছেলের পড়াশোনার খরচ—যতটুকু পারেন সাহায্য করেন। জমানো টাকাও খরচ করেন। অনেকে সুযোগ নেয়, তিনি বোঝেন না। এ নিয়ে আমার সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। তবে তিনি সন্তুষ্টি নিয়ে ঘুমান, এটা অনুভব করি।
বিদেশে আসার এক কারণ ছিল আম্মা-আব্বাকে নিয়ে আসা। কিন্তু পারিনি। আমরা দুই বোন দেশের বাইরে। দেশে আম্মার সঙ্গে আশিক আর এক সহকারী। তাঁর সবচেয়ে বড় সঙ্গী কাজ। এ বয়সেও কাজ নিয়ে ব্যস্ত। এটা আমাকে স্বস্তি দেয়। তাঁর ডায়াবেটিস, কিডনি সমস্যা, কানে শোনার অসুবিধা। কাজ তাঁকে একাকিত্ব থেকে রাখে।
আম্মার জীবন ত্যাগের মধ্য দিয়ে গেছে। প্রতি বছর ১০-১৫ দিন ঘুরে আসি। আমার মেয়ে আমাইরা আর আরিসা জানে, নানি সেলিব্রিটি। মুঠোফোনে কথা হয়। দূর থেকে মনে পড়ে। মিস করি তাঁর হাতের রান্না। মাছ খুব ভালো রাঁধেন, হালকা ঝোল ঝোল।






