রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে ইউজিসির নির্দেশিকা উপেক্ষা করে শর্ত শিথিল করা হয়েছে। এছাড়া উপাচার্যের গাড়িতে নির্ধারিত সীমার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি জ্বালানি তেল ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

ইউজিসির নির্দেশিকা অনুসারে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদে শিক্ষক হতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে ন্যূনতম সিজিপিএ-৩ দশমিক ৬ লাগবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় নিজেরাই সিজিপিএ-৩ দশমিক ২৫ নির্ধারণ করে। এমনকি এই শর্তও পালন করা হয়নি। এর চেয়ে কম সিজিপিএধারী প্রার্থীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

শুধু সিজিপিএ-র ক্ষেত্রেই নয়, প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ছাড়াই শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। এমনকি বিজ্ঞপ্তিপ্রাপ্ত পদের পরিবর্তে অন্য পদে শিক্ষক নেওয়া হয়েছে। এসব নিয়মভঙ্গ ইউজিসির পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আতিয়ার রহমানকে গত বছরের ৯ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়। তাঁর আমলে গত বছরের জুনে ২২ জন এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৭ জন শিক্ষক নিয়োগ হয়। প্রথম দফায় নিয়োগপ্রাপ্ত ২২ জনের মধ্যে ৭ জনের ক্ষেত্রে নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে বলে ইউজিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

ইউজিসি সূত্র জানায়, কমিশনের বাজেট অ্যাসেসমেন্ট দল গত বছরের ২৭ ও ২৮ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করে। তখন শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগে নিয়মভঙ্গ এবং অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের বিষয় চিহ্নিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত ২১ এপ্রিল ইউজিসির এসব পর্যবেক্ষণের জবাব দিয়েছে।

নিয়োগে অনিয়ম, স্থানীয় সংস্কৃতির অবমাননা, রাজনৈতিককরণের অভিযোগে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছে। গত মঙ্গলবার তারা উপাচার্যের কার্যালয়ে তালা দেয়।

শিক্ষক নিয়োগে শর্ত ভঙ্গ

ইউজিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিশনের অভিন্ন শিক্ষক নিয়োগ নির্দেশিকা না মেনে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি বিভাগে প্রভাষক পদে মুহাম্মদ ফারুক রহমান নিয়োগ পান। তাঁর স্নাতকে সিজিপিএ-৩ দশমিক ২৫ ছিল না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সহকারী অধ্যাপক পদে পিএইচডি ডিগ্রিসহ বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে এক বছরের সক্রিয় শিক্ষকতা বা গবেষণা অভিজ্ঞতার শর্ত ছিল। কিন্তু ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি বিভাগে আবদুল্লাহ আল মামুন এবং ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি বিভাগে জি এম সেলিম আহমেদকে সহকারী অধ্যাপক করা হয়েছে। তাঁদের সক্রিয় শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ছিল না।

ইউজিসির কাছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, একাধিকবার বিজ্ঞপ্তি দিলেও অভিজ্ঞ প্রার্থী পাওয়া যায়নি। তবে নিয়োগপ্রাপ্তদের পিএইচডি আছে, তারা যোগ্য।

এটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়। তাই শুরুতেই এভাবে নিয়ম ভঙ্গ করে, শর্ত শিথিল করে শিক্ষক নিয়োগ ঠিক হয়নি। একবার যদি এ ধারা শুরু হয়, ভবিষ্যতেও বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকবে।

মুহাম্মদ সিকান্দার খান, সভাপতি, সুজন, চট্টগ্রাম

ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি বিভাগে সহকারী অধ্যাপকের বিপরীতে মো. আবদুল হালিমকে প্রভাষক পদে; ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি বিভাগে অধ্যাপক পদের বিপরীতে মো. মতিউর রহমান চৌধুরীকে সহযোগী অধ্যাপক পদে, একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপকের বিপরীতে মুহাম্মদ ফররুখ রহমানকে প্রভাষক পদে এবং কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক পদের বিপরীতে মুহাম্মদ জামশেদ আলম পাটওয়ারীকে সহযোগী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ইউজিসি এসবকে নিয়ম ভঙ্গ বলছে। ২০১৯ সালে জনবল নিয়োগে ইউজিসি আটটি শর্ত দিয়েছিল। এর মধ্যে অনুমোদিত পদ ছাড়া পদ পরিবর্তন বা উচ্চতর পদের বিপরীতে নিম্নতর পদে নিয়োগ যাবে না। কমিশনের অনুমোদন ছাড়া এক পদের বিপরীতে অন্য পদে নিয়োগের সুযোগ নেই। খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগেও অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

দ্বিগুণ তেল ব্যবহার উপাচার্যের

ইউজিসির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উপাচার্যের জন্য মাসে ২০০ লিটার জ্বালানি নির্ধারিত ছিল। অর্থাৎ মাসে ২৪ হাজার টাকার জ্বালানি (প্রতি লিটার অকটেন ১২০ টাকা) এবং বছরে ২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। কিন্তু উপাচার্যের পাজেরো জিপে বছরে ৪ লাখ ৪২ হাজার ৫৫৩ টাকা খরচ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, ঢাকায় দাপ্তরিক কাজে আসা-যাওয়ার জন্য বেশি তেল লেগেছে।

কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়

এসব অনিয়ম নিয়ে উপাচার্য আতিয়ার রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা ইউজিসিতে ব্যাখ্যা দিয়ে দিয়েছি।’ তিনি আর মন্তব্য করেননি।

ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ মুঠোফোনে জনসংযোগ শাখার সঙ্গে কথা বলতে বলেন। জনসংযোগ অতিরিক্ত পরিচালক মো. রোকনুজ্জামান উপপরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের দিকে ঠেলে দেন। গত মঙ্গলবার আবদুল মান্নান জরুরি মিটিংয়ে ব্যস্ত বলে জানান।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সভাপতি ও ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মুহাম্মদ সিকান্দার খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, শিক্ষক নিয়োগের ন্যূনতম যোগ্যতার শর্ত শিথিল করে শিক্ষক নিয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা গর্হিত কাজ। এক পদের বিপরীতের আরেক পদে নিয়োগ ঠিক হয়নি। এটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়। তাই শুরুতেই এভাবে নিয়ম ভঙ্গ করে, শর্ত শিথিল করে শিক্ষক নিয়োগ ঠিক হয়নি। একবার যদি এ ধারা শুরু হয় ভবিষ্যতেও বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকবে।