মুক্তকণ্ঠর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’ প্রতি বৈশাখে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিভার ছাপ রেখে সম্ভাবনাময় তরুণদের নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে ক্রীড়া, অভিনয়, সংগীত, ব্যবসা, গবেষণায় অগ্রগামী ৭ তরুণের গল্প নিয়ে এসেছে। এবার পড়ুন অভিনয়শিল্পী কেয়া পায়েলের অগ্রগতির কাহিনি।
ছয় বছর আগে করোনার পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছিল। তখন আমার রচনা ও পরিচালনায় অবুঝ মন নাটকে কাজ করেন কেয়া পায়েল। এটাই ছিল আমাদের প্রথম যৌথ কাজ। এতে তার সহশিল্পী ছিলেন ফারহান আহমেদ জোভান। রাজধানীর ৩০০ ফিট সড়ক ও আশপাশে শুটিং হয়। ২০২০ সালের আগস্টে নাটকটি মুক্তি পায়। কেয়া পায়েলের অভিনয় এতে দর্শকদের নজর কাড়ে। তার নিজের মুখেই শুনেছি—এটাই ছিল তার প্রথম হিট কাজ।
এরপর আমার পরিচালনায় ট্রু স্টোরি (২০২১), মরণের পরে (২০২২), পিতা মাতা সন্তান (২০২৩) ও ঈদ ভ্যাকেশন (২০২৪) নাটকে অভিনয় করেন কেয়া। সর্বশেষ আমাদের গল্প সিরিজে মেহরীন চরিত্রে তার উপর আস্থা রাখি। কারণ জানতাম, এই চরিত্রের আবেগ, দ্বন্দ্ব ও নীরব আর্তনাদ প্রকাশে যে সংবেদনশীলতা দরকার, তা তার কাছ থেকে পাওয়া যাবে। সে আমার আস্থার যথাযথ প্রতিদান দিয়েছে।
আমাদের গল্প সিরিজটি ছিল স্বপ্নের এক কাজ। এতে মধ্যবিত্ত পরিবারের চেনা আবেগের আখ্যান বলতে চেয়েছি। মেহরীন চরিত্রটি সূক্ষ্ম অনুভূতি, না-বলা কথা ও সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রতীক। কেয়া পায়েল এতে শুধু অভিনয় করেননি, নিজেকে চরিত্রের মধ্যে বিলীন করে দিয়েছেন।
শুটিংয়ে দেখেছি, প্রতি দৃশ্যের আগে দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ বসে নিজেকে প্রস্তুত করতেন তিনি, চরিত্রের নীরবতা অনুভব করতেন। এই প্রস্তুতি পর্দায় স্পষ্ট। সংলাপের মাঝে তার ক্ষুদ্র বিরতি, চোখের ভাষা, হালকা নিশ্বাস—সব মিলিয়ে মেহরীন হয়ে উঠেছেন বাস্তবের চেনা নারী। এ সিরিজে কেয়া প্রমাণ করেছেন, চরিত্রের গভীরতা ধারণ করতে পারেন। নির্মাতা হিসেবে এই অর্জনই আমার সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক।
কেয়া পায়েলের অভিনয়ে একটা অদ্ভুত সততা আছে। ক্যামেরা চালু হওয়ার আগেই তিনি চরিত্রে ঢুকে যান। সংলাপ তার কাছে শুধু শব্দ নয়, অনুভবের ধারা। চোখ কথা বলে, নীরবতা সংলাপের চেয়ে বেশি বলে। অনেক সময় দৃশ্য শেষেও চরিত্র থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসেন না। এটাই নিবেদিত শিল্পীর লক্ষণ।
অভিনয় কেয়ার কাছে পেশা নয়, আত্মসমর্পণ। প্রতি দৃশ্যে নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়েন। এই নিরলস সাধনা তাকে ছোটপর্দার সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেত্রীদের সারিতে নিয়ে গেছে। এটি হঠাৎ নয়, প্রতিদিনের প্রমাণের ফল।
২০১৮ সালে অভিনয়জীবন শুরু করেন কেয়া। গত ছয় বছরে চার শতাধিক নাটকে কাজ। শতাধিক নাটক ইউটিউবে কোটি ভিউ পার হয়েছে। নির্মাতা হিসেবে আমার কাছে বড় কথা, প্রতিটি কাজে একই গুরুত্ব দেন তিনি। অবুঝ মন-এর আন্তরিকতা আজও তার মধ্যে আছে।
ঢাকায় বেড়ে ওঠা কেয়া তিন ভাইবোনের বড়। অভিনয়ের পাশাপাশি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক। ইচ্ছা তার, যতদিন অভিনয়ে নিজে ও দর্শকের ভালোবাসা থাকবে, ততদিন চালিয়ে যাবেন।
আমার চোখে কেয়া পায়েল শুধু অভিনেত্রী নন, পরিশ্রমের মোড়কে সফল যাত্রা। যাত্রায় স্বপ্ন, শ্রম ও অভিনয়ভালোবাসার নিবেদন আছে। বিশ্বাস করি, তার পথচলা আরও দীর্ঘ ও দীপ্ত হবে। গল্পগুলোতে মনপ্রাণ ঢেলে ছাপ রেখে যাবেন বহুদিন।
লেখক: চলচ্চিত্র পরিচালক, নাট্যকার






