প্রতি বৈশাখে বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রতিভাবান তরুণদের নিয়ে মুক্তকণ্ঠর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’ বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে ক্রীড়া, অভিনয়, সংগীত, ব্যবসা, গবেষণায় অগ্রগামী ৭ তরুণের গল্প তুলে ধরেছে। এবার পড়ুন ফ্যাশন ডিজাইনার সাফিয়া সাথীর অসাধারণ যাত্রার কথা।

আমাদের ফ্যাশন জগতে চাকচিক্য ও আভিজাত্যের আধিপত্য চলাকালীন সাফিয়া সাথী যেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো উদয় হয়েছে। তিনি শুধু ফ্যাশন ডিজাইনার নন, একজন স্বপ্নদ্রষ্টা এবং সময়ের সত্যিকারের ‘গেমচেঞ্জার’।

সাফিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি, কখনো সহজ পথ বেছে নেননি তিনি। অন্যরা বিদেশি পোশাক আমদানি করে বিক্রি করলেও তিনি শুরু থেকেই নিজস্ব ডিজাইন ও দেশীয় ফ্যাব্রিক নিয়ে কাজ শুরু করেন। তার ডিজাইনের বড় বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তির নিজস্বতা অক্ষুন্ন রাখা। তিনি বিশ্বাস করেন, পোশাক ঢেকে রাখার জন্য নয়, মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলার জন্য। সময়, উপলক্ষ ও ব্যক্তিগত স্টাইল—এই তিন বিষয় মাথায় রেখে তিনি প্রতিটি ডিজাইন তৈরি করেন। ডিজাইনার হিসেবে সৌন্দর্যের পাশাপাশি দায়িত্বও নিয়েছেন সাফিয়া। তার কাজে সাসটেইনেবিলিটি পেয়েছে গুরুত্ব। অব্যবহৃত কাপড় বা জমে থাকা ফ্যাব্রিক দিয়ে নতুন ডিজাইন তৈরি করেন, যাতে অপচয় কমে এবং প্রতিটি ডিজাইনে ভিন্নতা আসে। সাফিয়া সাথীর প্রতিটি কাজ যেন একেকটি গল্প, সুই-সুতোর নিপুণ বুননে আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন।

এই অসাধারণ সৃজনশীলতা অল্প সময়েই তাকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। শোবিজ তারকারা তার কাছে এসে পৌঁছেছে। বিয়ে, রেড কার্পেট ও বিশেষ আয়োজনে তার ডিজাইন করা পোশাক পরছেন অনেক তারকা। বিশেষ করে বিয়ের পোশাকে স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন সাফিয়া সাথী। তার ব্রাইডাল ডিজাইনে ঐতিহ্য, আভিজাত্য ও আধুনিকতার মিশ্রণ কনেদের আত্মবিশ্বাসী করে। ফলে বিয়ের পোশাকের জন্য অনেকের কাছে তিনি প্রথম পছন্দ হয়ে উঠেছেন। সেলিব্রিটিদের পরনে তার ডিজাইন উঠলে তা কেবল ফ্যাশন নয়, এক শক্তিশালী স্টেটমেন্ট হয়ে ওঠে।

টাঙ্গাইলে সাফিয়া সাথীর বেড়ে ওঠা। বাবা ছিলেন আইনজীবী। বড় পরিবারে সৃজনশীল আবহে কেটেছে তাঁর শৈশব—ভাইয়েরা ছবি আঁকত আর পুতুলের জন্য পোশাক বানাত ছোট্ট সাফিয়া। ম্যাগাজিন আর পত্রিকার ফ্যাশন ক্রোড়পত্র সংগ্রহ ছিল তাঁর নেশা। খুব অল্প বয়সেই বন্ধু ও কাজিনদের পোশাকে নকশা করতে শুরু করেন। তখনই হয়তো অজান্তে গড়ে তুলছিলেন নিজের ভবিষ্যতের ভিত। কিন্তু স্বপ্ন দেখা যতটা সহজ, তাকে বাস্তবে পরিণত করাটা ততটা সহজ ছিল না। বড় দুই ভাই, দুই বোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। তাই পরিবারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার একধরনের চাপ ছিল। বাবা চেয়েছিলেন চাকরির বাজারে চাহিদা আছে, এমন কোনো বিষয় নিয়ে পড়ুক মেয়ে। ফলে ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে পড়ার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ২০১১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসোর্স ম্যানেজমেন্টে ভর্তি হন সাফিয়া। প্রথম বছরেই বুঝতে পারেন, নিজের আগ্রহের জায়গা থেকে সরে এসেছেন। এই শূন্যতাই তাঁকে নতুন কিছু করার তাগিদ দেয়। ২০১২ সালে নিজের হাতখরচের টাকা জমিয়ে শুরু তাঁর যাত্রা। কাপড় কিনে নিজে নকশা করা, সেলাই করা, আবার সেই পোশাক ফেসবুকে তুলে ধরা—সবকিছুই একা হাতে সামলাতে থাকেন। প্রথম বিক্রি, প্রথম অর্ডার, প্রথম প্রশংসা—এই ছোট ছোট অর্জনগুলোই তাকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগাতে থাকে। সেই সাহসের ডানায় ভর করেই সাফিয়া সাথী এখন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ফ্যাশন ডিজাইনার।

উচ্চ অর্জনের পরও তার বিনয়ী ও অমায়িক ব্যক্তিত্ব সবাইকে মুগ্ধ করে। খ্যাতির মোহ তাকে মাটি থেকে দূরে সরাতে পারেনি। তার ডিজাইন রাজকীয় হলেও সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য। সমসাময়িক রুচির সঙ্গে ঐতিহ্যের মেলবন্ধন তার অনন্য ক্ষমতা। অল্প সময়ে অর্জিত এই সাফল্যের মূলে তার নিরলস পরিশ্রম, একাগ্রতা ও কাজের প্রতি ভালোবাসা।

সাফিয়া সাথী প্রমাণ করেছেন, নতুন করার সাহস ও দৃঢ়তা থাকলে প্রচলিত ধারা ভেঙে নিজস্ব অবস্থান তৈরি সম্ভব। তার প্রতিটি সৃষ্টিতে নতুনত্বের ছোঁয়া, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। ফ্যাশনকে অনুভবের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।

তার পথচলার এখনও শুরু। তার দূরদর্শী চিন্তা ও সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিকে বিশ্বমঞ্চে উঁচুতে নিয়ে যাবে, এ আশা করা যায়।

হুমায়রা খান: ফ্যাশন ডিজাইনার