ছোটবেলা থেকেই অভিনয় জয়িতা দত্তর নিরাপদ আশ্রয়। ফিল্মফেয়ার পত্রিকাকে এক সাক্ষাৎকারে এই অভিনেত্রী বলেন, “সব সময়ই জানতাম, অভিনয় করতে চাই। কিন্তু কোনো কিছু ভালো লাগা আর সেটাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার মধ্যে একটা দূরত্ব থাকে, সেটা মেলাতে সময় লাগে।” শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক কাঠামো মানুষকে নির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করতে শেখায় বলেও তিনি মনে করেন। তাই করপোরেট জগত থেকে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন জয়িতা। তিনি বলেন, “আমি সে সবই করেছি। কারণ, মনে হয়েছিল, সেটাই ঠিক। কিন্তু আমার ভেতরের টান আমাকে অভিনয়ের দিকেই নিয়ে যাচ্ছিল।”
তারপর আদিল হুসেনের সঙ্গে দেখা হয়। এই অভিনেতার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া তাঁর জীবনের বড় মোড়। আদিলের মাধ্যমে কাস্টিং ডিরেক্টর দিলীপ শংকরের সঙ্গে পরিচয় হয়। এখান থেকেই জয়িতার অভিনয়জীবন শুরু। ‘এ অ্যান্ড সুইটেবল বয়’ ও ‘মনসুন ওয়েডিং: দ্য মিউজিক্যাল’-এ (নাটক) সুযোগ পান তিনি, যার পরিচালক মীরা নায়ার। তিনি বলেন, “এরপর আর পেছন ফিরে দেখিনি। করপোরেট চাকরি ছেড়ে পুরো সময়ের জন্য অভিনয়ে চলে আসি।”
সবশেষ জয়িতাকে দেখা গেছে জিও হটস্টারের ‘দ্য গ্রেট শামসুদ্দিন ফ্যামিলি’ ছবিতে। শিগগিরই অ্যামাজন প্রাইমে আসছে আলোচিত সিরিজ ‘দাহাড়’-এর দ্বিতীয় মৌসুম। ছবিতে লতিকা চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নজর কেড়েছেন। সহ-অভিনেতা হিসেবে ছিলেন কৃতিকা কামরা, শ্রেয়া ধন্বন্তরী, জুহি বাব্বর, ফরিদা জালাল ও শিবা চাড্ডা। ছবি পরিচালনা করেছেন অনুষা রিজভি। জয়িতা বলেন, “সকালে অডিশন দিই আর রাতে ফোন আসে যে আমি নির্বাচিত।”
ছবির প্রতিক্রিয়া নিয়ে জয়িতা বলেন, “আমার প্রথম বড় জয় হলো অনুষা রিজভির ভালোবাসা। এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোনো তরুণ অভিনেতা তাঁর ওপর প্রভাব ফেলেছে কি না, সেখানে তিনি আমার নাম বলেছেন। একজন পরিচালকের কাছ থেকে এমন স্বীকৃতি পাওয়া আমার কাছে বিশাল ব্যাপার।” বরুণ গ্রোভারের কাছ থেকেও প্রশংসাসূচক বার্তা পেয়েছেন তিনি।
আসাম থেকে মুম্বাইয়ে এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার কথা বলে জয়িতা বলেন, “প্রত্যেক মানুষকেই নিজের পথ খুঁজে নিতে হয়। আমরা অনেক সময় ভাবি, কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম আছে, কিন্তু আসলে সেগুলো মনগড়া ধারণামাত্র। আমিও একসময় ভেবেছিলাম, অভিনেতা হতে গেলে বিশেষ দেখতে বা নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে কথা বলতে হবে। কিন্তু সেটা আমি নিজেই নিজের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছিলাম। আসলে এমন কোনো নিয়ম নেই। আমি সেই নিয়মের মধ্যে নিজেকে বেঁধে রাখতেও পারতাম না।” তিনি আরও বলেন, “সত্যিকারের গল্প বলার জন্য সেই কমিউনিটির মানুষদের সঙ্গে কাজ করা জরুরি। তাহলে গল্প নিজে থেকেই বাস্তব হয়ে ওঠে।”
বলিউড ইন্ডাস্ট্রির মানুষদের থেকে সমর্থন পাওয়ার প্রশ্নে জয়িতা বলেন, “সিনিয়র অনেকের কাছ থেকে সাহায্য পেয়েছি। তিলোত্তমা সোম, আদিল হুসেন বা মীরা নায়ারের মতো মানুষেরা আমার পাশে আছেন। অনেকের কাছেই পরামর্শ চাই। তবে এই ইন্ডাস্ট্রির বিষয়ে মানুষ যথেষ্ট কথা বলেন না।” তিনি যোগ করেন, “তবে এটাকে পুরোপুরি ‘ইন্ডাস্ট্রি’ বলা কঠিন। কারণ, এটি সংগঠিত নয়। আর এখানে ‘মেন্টরশিপ’ নিয়ে ধারণা খুবই অস্পষ্ট, যা নতুনদের জন্য বিভ্রান্তিকর হতে পারে। করপোরেট ব্যাকগ্রাউন্ড থাকার কারণে আমি মানুষজনের কাছে পৌঁছাতে পেরেছি।”
ইসরায়েলের গণহত্যা নিয়ে কথা বলে সিনেমা থেকে বাদ পড়েন এই অভিনেত্রী। জয়িতা বলেন, “এই পেশায় দীর্ঘ সময় কাজ না থাকার মতো মুহূর্ত আসে, অনিশ্চয়তা থাকে, আর এটাই বাস্তবতা। এটা নিয়ে অভিযোগ করার কিছু নেই। আপনাকে নিজের সাপোর্ট সিস্টেম ও মেন্টরশিপের মাধ্যমে এগোতে হবে। আশা করি, ভবিষ্যতে আমিও অন্যদের জন্য সেই ভূমিকা পালন করতে পারব।”
ইন্ডাস্ট্রির কাঠামোগত সমস্যা নিয়ে তিনি বলেন, “একটি প্রকৃত ইন্ডাস্ট্রিতে কিছু নিশ্চয়তা থাকে, যা আমাদের এখানে নেই। স্বাস্থ্যবিমা, ন্যূনতম মজুরি—এসব বিষয় এখনো অনেকে জানেনই না। কিন্তু এমন অনেক দেশ আছে, যেখানে শিল্পীদের জন্য এসব ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের এখানেও যদি তা হয়, খুব ভালো হবে।”
মীরা নায়ারের সঙ্গে প্রথম অডিশনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে জয়িতা বলেন, “গুরগাঁও থেকে তাড়াতাড়ি অফিস শেষ করে মেট্রো করে আমি ওখলায় গিয়েছিলাম। সেটাই ছিল আমার প্রথম অডিশন। আমি ভাবছিলাম, যা-ই হোক, অন্তত তাঁর (মীরা নায়ার) সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পাব।” তিনি আরও বলেন, “তাঁর চোখে অসাধারণ শক্তি আছে, যা আপনাকে আবিষ্ট করে রাখবে। তিনি এমনভাবে কথা বলেন, যাতে আপনি নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করবেন। অডিশনের আগে প্রায় আধা ঘণ্টা তিনি আমার পরিবার, আমার বড় বোন, আমার কাজ—এসব নিয়ে কথা বলেছিলেন। তিনি সত্যিই জানতে চান আপনি কে। এর ফলে অডিশনের আগেই একটা সংযোগ তৈরি হয়ে যায়।”
সামনে তিলোত্তমা সোম, শেফালি শাহ, আলিয়া ভাট ও কঙ্কণা সেনশর্মার সঙ্গে কাজ করতে চান জয়িতা। পরিচালকদের মধ্যে তাঁর পছন্দ বিশাল ভরদ্বাজ, অনুরাগ কশ্যপ, রিমা কাগতি ও সুজিত সরকার।






