জন্মদিনে ফোন, খুদেবার্তা আর সোশ্যাল মিডিয়ায় শুভেচ্ছার বন্যায় ভরে ওঠে দিনটা। এই ভালোবাসাকে কৃতজ্ঞতায় নিবেদন করলেন নব্বই দশকের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক নাইম।
তাঁর মতে, ‘সবাই যে এখনো মনে রাখছে, এটা শুকরিয়া। সিনেমা তো ছেড়ে দিয়েছি অনেক আগে, তারপরও আল্লাহর রহমতে মানুষ আমাদের (শাবনাজ–নাইম) দুজনকে মনে করেন, ভালোবাসেন। বিশেষ দিনে ফোন করেন, এসএমএস করেন—এসব অনেক বড় পাওয়া। আমি তো অল্প কয়েকটা ছবিতে অভিনয় করেছি, তারপরও যে মানুষ মনে রেখেছে, এটা সত্যিই বিস্ময়ের।’ মুক্তকণ্ঠকে জন্মদিনে এভাবে অনুভূতি জানালেন নাইম।
১৯৭০ সালের ৮ মে ঢাকার ধানমন্ডিতে জন্মগ্রহণ করেন নাইম, পুরো নাম খাজা নাইম মুরাদ। তিনি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের আবহে বড় হয়েছেন। ঢাকার নবাব পরিবারের বংশধর তিনি—নবাব স্যার সলিমুল্লাহ তাঁর প্রপিতামহ। শাহবাগ ও মগবাজারে কেটেছে শৈশব, তবে গ্রামের টানও ছিল তার জীবনে। টাঙ্গাইলের করটিয়া জমিদারবাড়ি এবং দেলদুয়ারের পাতরাইলের সঙ্গে তাঁর শিকড়ের গভীর সম্পর্ক, যা পরে আরও স্পষ্ট হয়।
চলচ্চিত্রে প্রথম অভিষেক হয় ‘চাঁদনী’ ছবিতে, পরিচালক এহতেশাম। এই ছবিতেই গড়ে ওঠে জনপ্রিয় নাইম-শাবনাজ জুটি। পর্দার রসায়ন বাস্তবে প্রেমে রূপ নেয় দ্রুত। ‘বিষের বাঁশি’র কাজের সময় শুরু হয় প্রেম, ‘লাভ’ ছবিতে তা গভীর হয়। প্রথমে কেউ অনুভূতি প্রকাশ করেননি—অভিমানী নীরবতা কাজ করেছিল দুজনের মধ্যে। অবশেষে ১৯৯৪ সালের ৫ অক্টোবর ভালোবেসে বিয়ে করেন তাঁরা।
বিয়ের পরপরই বাবার মৃত্যু নাইমকে নাড়িয়ে দেয়। সেই কঠিন সময়ে শাবনাজ অটল থেকেছেন পাশে। এই সম্পর্ক শুধু পর্দার নয়, জীবনের সংগ্রামেও একে অপরের ভরসা। নাইম-শাবনাজ জুটি অল্প ছবিতে অভিনয় করলেও প্রতিটি দর্শকের মনে ছাপ ফেলেছে। ‘চোখে চোখে’, ‘সোনিয়া’, ‘দিল’, ‘টাকার অহংকার’, ‘অনুতপ্ত’, ‘জিদ’ বা ‘ঘরে ঘরে যুদ্ধ’—এগুলো পরিবারকেন্দ্রিক বিনোদন। ২০০১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ঘরে ঘরে যুদ্ধ’ তাঁদের শেষ ছবি, এরপর নাইম ধীরে ধীরে পর্দা থেকে সরে আসেন।
এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নাইমের নিজস্ব চিন্তা। তাঁর মতে, ঠিক সময়ে বিদায় নেওয়াই জনপ্রিয়তা স্থায়ী করেছে।
নাইম বললেন, ‘যখন চলচ্চিত্রের মান অবনতির দিকে যাচ্ছিল, তখন সেই স্রোতে গা না ভাসিয়ে নিজেকে সরিয়ে নেওয়াই ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে আমাদের সিনেমাগুলো বিটিভির মাধ্যমে ঘরে ঘরে পৌঁছে যাওয়ায় পারিবারিক দর্শকের সঙ্গে এক গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়, যা আজও টিকে আছে।’
চলচ্চিত্রের ঝলমলে জগৎ ছাড়াই নাইম নতুন জীবন গড়েছেন। টাঙ্গাইলের পাতরাইলে কৃষি ও উৎপাদনভিত্তিক ব্যস্ততা—মাছের খামার, ফলের বাগান, পশুপালন, তাঁতের কারখানা। গ্রামবাসীদের সঙ্গে মিশে তাঁর সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়েছেন।
তিনি একটি ক্লাব গড়ে প্রতি বছর ক্রিকেট টুর্নামেন্ট করেন, যাতে শহরের শিল্পীরাও যোগ দেন—গ্রাম-শহরের মেলবন্ধন। সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজে তাঁর সক্রিয়তা রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে কাজগুলো সুসংগঠিত করার স্বপ্ন দেখেন। গ্রাম তাঁর কাছে স্মৃতি ও দায়িত্বের স্থান।
নাইম-শাবনাজ জুটির জনপ্রিয়তা নিয়ে আজও আলোচনা হয়, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে তুলনা হয়। তিনি মনে করেন, শাবানা-আলমগীর ও রাজ্জাক-কবরীর মতো কিংবদন্তি জুটির ধারায় নিজেদের নাম উচ্চারিত হওয়া বড় প্রাপ্তি। আজকের দিনে মানুষের ভালোবাসাই সবচেয়ে বড়, যা সময়ের সঙ্গে গভীর হয়েছে। জন্মদিনের শুভেচ্ছাগুলো তাঁর পথচলার স্বীকৃতি মনে করেন তিনি।






