আজ ৮ মে। বেঁচে থাকলে শর্মিলী আহমেদ আজ ৭৯ বছর বয়সে পা দিতেন—ঢাকাই বিনোদনজগতের এক উজ্জ্বল, নির্ভরযোগ্য ও মমতাময়ী মুখ। ২০২২ সালের ৮ জুলাই তাঁর মৃত্যু হয়। তবে তাঁর রেখে যাওয়া ভালোবাসা, অভিনয়ের স্মৃতি এবং জীবনের গভীর মানবিক অধ্যায় আজও আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে। জন্মদিনে ভক্তরা তাঁকে স্মরণ করছেন—একজন মা, শিল্পী ও সংগ্রামী নারীর প্রতীক হিসেবে।

শৈশবেই অভিনয়ে
শর্মিলী আহমেদের প্রকৃত নাম ছিল মাজেদা মল্লিক। ১৯৪৭ সালের ৮ মে তিনি রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র চার বছর বয়সেই অভিনয়জগতে তাঁর প্রবেশ ঘটে। রাজশাহী বেতারের শিল্পী হিসেবে প্রথম শিল্প-পরিচয় তৈরি করেন। পরে ১৯৬২ সালে রেডিও এবং ১৯৬৪ সালে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়। তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘ঠিকানা’ (উর্দু ভাষায় নির্মিত) মুক্তি না পেলেও, সুভাষ দত্তের পরিচালনায় ‘আলিঙ্গন’, ‘আয়না ও অবশিষ্ট’ ও ‘আবির্ভাব’-এর মতো ছবিতে দ্রুত নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। স্বাধীনতা-পূর্ব উর্দু চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন। স্বাধীনতার পর ‘রূপালী সৈকতে’, ‘আগুন’, ‘দহন’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমায় তাঁর উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।

ক্যামেরার সামনে শিল্পী, বাইরে এক মা
শর্মিলী আহমেদের অভিনয়জীবন শুধু সিনেমায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ৮০ ও ৯০ দশকে টেলিভিশন পর্দায় তিনি সবচেয়ে পরিচিত মা চরিত্রের প্রতীক হয়ে ওঠেন। মায়াবী মুখ, শান্ত কিন্তু দৃঢ় উপস্থিতি এবং আবেগের সূক্ষ্ম প্রকাশে তিনি মা, দাদি বা পরিবারপ্রীতির প্রতিচ্ছবি ছিলেন। বাস্তব জীবনেও তাঁর ‘মা’ চরিত্র ছিল গভীর। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “আমার কাছে পরিবার আগে, তারপর কাজ।” এই দৃষ্টিভঙ্গিতে মা হওয়ার পর অভিনয় থেকে কিছুটা বিরত থাকেন। মেয়ে তনিমা আহমেদকে মানুষ করতে কাজ কমান। ঢাকার বাইরে শুটিং এড়িয়ে যান। যেতে হলে রাত হলেও বাসায় ফিরতেন। না ফিরতে পারলে বোনকে নিয়ে এসে মেয়ের দেখাশোনার ব্যবস্থা করতেন। তনিমা আহমেদ নিজেও অভিনেত্রী। মা-মেয়ের মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শর্মিলী আহমেদ বলেছিলেন, “আমি জানি না মা হিসেবে কতটা পেরেছি, কিন্তু এটুকু জানি, ব্যস্ততার কারণে মেয়েকে অবহেলা করিনি।”

কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা
শুটিং সেটে সময়নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের প্রতীক ছিলেন তিনি, বাড়িতে দায়িত্বশীল গৃহিণী। রান্নাঘরের মেনু বুঝিয়ে সবার খাবার নিশ্চিত করে তবেই শুটিংয়ে যেতেন। সহকর্মীরা শ্রদ্ধায় ডাকতেন ‘শর্মিলী মা’। শুধু মায়ের চরিত্র নয়, তাঁর মুখে জীবনের গল্প ফুটে উঠত। নাটক বা সিনেমায় তাঁর উপস্থিতি দৃশ্যগুলোকে মানবিক করে তুলত।

ছয় দশকের পথচলা

শর্মিলী আহমেদের অভিনয়জীবন ছিল দীর্ঘ ও বহুমুখী। ১৫০টির বেশি চলচ্চিত্র এবং প্রায় ৪০০ নাটকে অভিনয় করেছেন। যেকোনো চরিত্রই বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতেন তিনি। স্বামী রকিবউদ্দিন আহমেদ ছিলেন পরিচালক। দাম্পত্য ও পেশাগত জীবনে তারা একে অপরের পরিপূরক ছিলেন। ‘পলাতক’ ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁর আত্মনিবেদনই ছিল অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি।

আজও হৃদয়ে মায়ের মতোই রয়ে গেছেন

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শর্মিলী আহমেদ। ক্যানসার ও বয়স বাড়লেও থামেননি। ভাঙা শরীর নিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন, কারণ অভিনয় ছিল তাঁর সাধনা। ২০২২ সালের ৮ জুলাই ৭৬ বছর বয়সে মারা যান। তাঁর শূন্যতা অপূরণীয়। মৃত্যুতে শিল্পীমহল কাঁদে, অনুরাগীরা শ্রদ্ধায় স্মরণ করে। আজ জন্মদিনে সামাজিক মাধ্যমে অনেকে পুরোনো ছবি পোস্ট করে স্মৃতিচারণ করছেন। শর্মিলী আহমেদ বাঙালির মানসপটে চিরন্তন মায়ের মুখ। ক্যামেরার সামনে চরিত্রকে বাঁচিয়ে তুলতেন, বাস্তবে পরিবারের সঙ্গী ও আশ্রয় ছিলেন। স্মৃতিতে, পর্দায়, হৃদয়ে তিনি চিরকাল আছেন।