চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের অবদান অসাধারণ। গত শতকের সত্তর–আশির দশকে এখানকার মানুষের বিদেশ যাত্রা বেড়ে যায়। এখন অনেক পরিবারেই একাধিক সদস্য বিদেশে রোজগার করে টাকা পাঠান। ফলে জীবনমান উন্নত হয়েছে এবং নতুন ব্যবসাগুলো প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।

সন্তোষপুর ইউনিয়নের উত্তর সন্তোষপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেয়াল ঘেঁষে একতলা পাকা দালান চোখে পড়ে। ভবনের দুপাশে সুন্দর টাইলসের সানশেড এবং শৌখিন নির্মাণশৈলী। আশপাশে আরও কয়েকটি নতুন পাকা বাড়ি দেখা যায়। একসময় এখানে টিনের আধা পাকা বাড়ি ছিল প্রধান। আয়ের উৎস ছিল কৃষিকাজ। কিন্তু এখন কাঁচা বাড়িগুলো পাকা হয়েছে, বাজারে দোকান বেড়েছে। এর পিছনে প্রবাসী আয়ই কারণ। গ্রামের অনেক পরিবারে দু-একজন বিদেশে। তাদের শ্রমে গ্রাম বদলে উঠছে।

ধানখেতের পাশে আধুনিক কৃষি খামার চোখে পড়ে। এখানে ধান, হাঁস, গরু, মাছ ও সবজি বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়। আটজন শ্রমিক কাজ করেন। মালিক মনিরুজ্জামান আগে দুবাইয়ে হিসাবরক্ষক ছিলেন। তার উপার্জনে পাকা বাড়ি হয়েছে। দেশে ফিরে ‘সতেজ কৃষি খামার’ গড়েছেন।

আরিফুল ইসলাম নামের সৌদি আরব প্রবাসী একতলা পাকা বাড়ি করেছেন। তার ষাটোর্ধ্ব বাবা মো. ছুফিয়ান বলেন, তিনি নিজেও ভাগ্য ফেরাতে ১৯৮৫ সালে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। কিন্তু সুবিধা হয়নি। এখন দুই ছেলে বিদেশে। এক ছেলে বাড়ি করেছে। আর তাঁকে টিনের ঘরে কষ্ট করতে হয় না।

সন্তোষপুরে প্রবাসী সংখ্যা সঠিক নয়, তবে ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ২৫০ পরিবারের মধ্যে অন্তত ৩০০ সদস্য প্রবাসে। ইউপি সদস্য মো. আশরাফ জানান, এলাকা গত কয়েক দশকে বদলে গেছে। পাকা বাড়ি, দোকান বেড়েছে। অর্থনীতির চালচিত্র বদলে গেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানও ২০২৫ সালে সন্দ্বীপে আয়োজিত একটি সভায় সন্দ্বীপের প্রবাসীরা প্রায় দেশের মোট প্রবাসী আয়ের ১৩ শতাংশের জোগান দেন বলে উল্লেখ করেছিলেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফাওজুল কবির খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এমন একটা কথা বিভিন্ন সময়ে শুনে এসেছি। কিন্তু এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য-উপাত্ত পাইনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা আমাকে তথ্যটি জানিয়েছিলেন। উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান না থাকলেও সন্দ্বীপবাসীর পাঠানো প্রবাসী আয়ের হার হবে অতি উচ্চ।’

সন্দ্বীপজুড়ে এমন পরিবর্তন। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ২ হাজার ৮০ জন বিদেশে গেছেন। প্রবাসীরা সৌদি আরব, কাতার, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্য এবং যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্রে। মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি।

রেমিট্যান্স বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সিলেকশন গ্রেডের অধ্যাপক প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জি বলেন, দেশের ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে প্রবাসী আয়ের তালিকায় সন্দ্বীপ উপরে। আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান নেই, তবে সন্দ্বীপের প্রবাসীরা মোট রেমিট্যান্সের উল্লেখযোগ্য অংশ দেন, এ দাবি যুক্তিযুক্ত।

হারামিয়া এলাকার এস এম আবদুল মান্নান বলেন, তাঁর পরিবার ও স্বজন মিলে ৬৩ জন কাতারে।

মাইটভাঙ্গা ইউনিয়নের দোতলা বাড়ি দেখলে ঢাকা–চট্টগ্রামের অভিজাতপাড়া মনে পড়ে। নকশাদার স্তম্ভ, ঝুলবারান্দা। দুবাই প্রবাসী শাহাদাত হোসেন করেছেন। এমন বাড়ি আরও আছে, বেশিরভাগ প্রবাসীদের। উল্লেখযোগ্য যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীও।

দর্শনীয় বাড়ি, পোশাকের দোকান

পোলিশ্যা বাজারের ব্যবসায়ী জিয়াউল আহসান বলেন, প্রবাসীরা বাড়ি করেছে, টাকা পাঠায়। গ্রামীণ অর্থনীতি বদলে গেছে। নতুন খাবার, পোশাক, নিত্যপণ্যের দোকান উঠেছে।

মাইটভাঙ্গার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের শফিউল আযম বলেন, ‘আমার দুই ভাইসহ পরিবারের সাত সদস্য আমেরিকায় আছেন। দেশে ব্যবসা করছি। কাগজপত্র তৈরি হলে আমিও যাব।’

আকবরহাট বাজারে ক্রেতাদের ৮০ ভাগ প্রবাসী পরিবার। ‘স্টাইল অ্যাভিনিউ’ দোকানের মালিক মাহমুদুল হাসান বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে ভালো ব্র্যান্ডের পোশাক আনেন। ৭০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকার শার্ট-প্যান্ট, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত শাড়ি। বেশিরভাগ ক্রেতা প্রবাসী পরিবার।

সন্দ্বীপের বাসিন্দাদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা অনেক পুরোনো। ইতিহাসবিদদের মতে, ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই জাহাজে চাকরির সুবাদে সন্দ্বীপের লোকজন বিদেশে পাড়ি জমানো শুরু করেন। পরে গত শতকের সত্তর ও আশির দশকে বিদেশে যাওয়ার হার বাড়তে থাকে।

মুন্সীরহাটের বিকাশ এজেন্ট আমিনুর রসুল বলেন, ক্যাশ আউটের বেশিরভাগ গ্রাহক প্রবাসী পরিবার। অনেকে চট্টগ্রাম থেকে বিকাশে টাকা পাঠান।

স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংকের সন্দ্বীপ শাখার ব্যবস্থাপক পারভেজ-উর-রহমান বলেন, মোট লেনদেনের ৬০ শতাংশ প্রবাসীরা করেন।

যেভাবে বিদেশের পথে

ব্রিটিশ আমলে জাহাজে লস্কর হয়ে ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রে যান। ‘সন্দ্বীপ সন্দর্শন’ ও ‘সন্দ্বীপের ইতিহাস’ বইয়ে তথ্য আছে। আশির দশকে মধ্যপ্রাচ্যে যান। প্রথম প্রজন্মের সাফল্য দেখে অনেকে অনুসরণ করেন।

‘দেশের ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে প্রবাসী আয়ের তালিকায় সন্দ্বীপ উপজেলা ওপরের দিকে থাকবে। এখানকার মানুষ কত ভাগ রেমিট্যান্সের জোগান দেন, আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান দ্বারা তা নির্ধারিত নয়। তবে সন্দ্বীপের প্রবাসীরা দেশের মোট রেমিট্যান্সের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের জোগানদাতা, এমন দাবি যুক্তিযুক্ত।’
অধ্যাপক প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জি, রেমিট্যান্স বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সিলেকশন গ্রেডের অধ্যাপক।

প্রতারণার ফাঁদ

দক্ষতার অভাবে প্রতারিত হয়ে অনেকে নিঃস্ব। সন্তোষপুরের আরিফ হোসেন সৌদিতে ২৭ দিনে ফিরেছেন। বলেন, ‘উপার্জনের আশায় দোকান বিক্রি করে ভিসা নিয়েছিলাম। এখন কোনো সম্বল নেই।’

প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের তানজিম উল হক বলেন, ‘অনেকে ভুয়া চুক্তিতে ভিটেমাটি বিক্রি করে বিপদে পড়েন।’ সাবেক ইউপি সদস্য মো. সামছুদ্দীন বলেন, প্রতারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণ দরকার।

উপজেলা কমপ্লেক্সের কাছে কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র। গত বছর ৭৫০ জন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শরফুদ্দিন বলেন, বর্তমানে ৩০০ জন প্রশিক্ষণার্থী। বিদেশে যাওয়াদের দক্ষ করে গড়ে তোলা লক্ষ্য।