আমেনা বেগম চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে প্রায় অচেতনের মতো বসে ছিলেন। হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে আর্তচিৎকার, ‘বাবারে কিন্তু আমি বুকে নিয়া বাসায় যামু’। স্বজনেরা তাঁকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু আমেনা বেগম শান্ত হলেন না।
‘আমি তো বাবারে এমনে আনি নাই, এখন এমনে কেমনে নিয়া যামু’, ‘বাবা তো আমার কাছে আর আসব না’, ‘আল্লাহ কেন দয়া করল না’, ‘বাবা আমার আগে কেন চইল্যা গেল’, ‘বাবারে কত কষ্ট দিছি, বাবা মাফ কইরা দিয়ো’... এভাবে আক্ষেপ চলতেই থাকে মা আমেনার।
তাকরিমের ‘লাইফ সাপোর্ট’ খুলে নেওয়া থেকে শুরু করে অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে হতে দুপুর হয়ে যায়। অ্যাম্বুলেন্সের পেছনের সিটে তাকরিমের কাফনে মোড়ানো ছোট মরদেহটা রাখা হয়। আমেনা বেগমকে বসানো হয়েছিল সামনের সিটে। তখন তাঁকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। মা পেছনে তাকালেও ছেলের মরদেহের দিকে সরাসরি তাকাতে পারছিলেন না।
গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম ও অন্যান্য জটিলতায় মারা যায় পাঁচ মাস বয়সী মো. তাকরিম। সেখানে মা আমেনা বেগম আর বাবা মো. মহসীন একটানা বিলাপ করছিলেন। ভোলা জেলার বাংলাবাজারে তাঁদের বাড়ি।
গতকাল সকাল ১০টায় শিশুটি মারা যাওয়ার পর বেলা আড়াইটা পর্যন্ত মা–বাবা হাসপাতালেই ছিলেন। তখন তাঁদের সঙ্গে কথা বলার মতো পরিস্থিতি ছিল না।
মো. মহসীন একসময় মুঠোফোন বের করে তাঁর মাকে ফোন দিলেন। ওপাশ থেকে ফোন ধরার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন, ‘মা, তোমার নাতিরে আল্লায় নিয়া গেছে গো, তোমার নাতি দুনিয়া ছাইড়া চলিয়া গেছে গো, তোমার রুমে যাইয়া আর কান্না করব না তোমার নাতি।’
পিআইসিইউর (শিশুদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র) দরজার একদম সামনেই ছিল তাকরিমের বিছানা। দরজার কাছ থেকেই তাকরিমের মরদেহ দেখার অনুমতি দেন চিকিৎসক। শিশুটির মরদেহ বিছানায় শোয়ানো, তখন সেখানে থাকা অন্য মায়েদের নিজের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকতে দেখা গেছে।
ভোলা থেকে ঢাকা, আবার ভোলায় ফেরা
ভোলা থেকে ঢাকা, আবার ঢাকা থেকে ভোলায় ফেরা—সব মিলে এক মাসের লড়াই। জ্বর-কাশি, র্যাশসহ নানা জটিলতায় তাকরিমকে প্রথমে ভোলার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। হাসপাতাল, হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরা আবার চিকিৎসকের চেম্বারে দেখানো—এভাবে অনেকটা সময় চলে যায়।
আমেনা বেগম বলছিলেন, ছেলের হাতে ক্যানোলা থাকতে থাকতে হাত ফুলে গিয়েছিল। তিন বেলা ইনজেকশন দিতেন চিকিৎসকেরা। একসময় মুখে খাওয়ানোর ওষুধ দেন। ২০টির মতো মলমই লাগানো হয়।
বাবা মহসীন জানান, ভোলায় চিকিৎসকেরা ছেলের হাম শনাক্ত করতে পারেননি। অ্যালার্জি হয়েছে জানিয়ে চিকিৎসা করেছেন। দিন দিন ছেলের অবস্থা খারাপ হতে থাকে। ‘ডাক্তারের কাছে ১০০ বার জিজ্ঞেস করছি বাচ্চাটার কি হাম হইছে? শুধু বলছে অ্যালার্জি হইছে। একটা বারও যদি হামের কথা বলত, তাইলে ছেলেরে আরও আগেই ঢাকায় নিয়া আসতাম’—বলেন বাবা।
তাকরিমের অবস্থা খারাপ হলে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখানকার চিকিৎসকেরা প্রথমে জানান হাম ও হাম–পরবর্তী নিউমোনিয়াসহ নানা জটিলতার কথা। দুদিন এই হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর চিকিৎসকেরা জানান, তাকরিমের জন্য পিআইসিইউ লাগবে। সরকারি হাসপাতালে পিআইসিইউ না পেয়ে তাকে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
গতকাল তাকরিমের খালু কুদরতুল্লাহ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ভোলায় সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে হামের চিকিৎসা নিয়ে নৈরাজ্য চলছে। অব্যবস্থাপনা ও ভুল চিকিৎসার শিকার হয়েছে শিশুটি।
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনআইসিইউ (নবজাতকদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র) ও পিআইসিইউর সিনিয়র রেজিস্ট্রার মো. আব্দুর রাজ্জাক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, শিশুটিকে হাম ও হাম–পরবর্তী জটিলতা নিয়ে একদম শেষ পর্যায়ে এ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। সকাল ১০টার দিকে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা।
হাসপাতাল থেকে দেওয়া তাকরিমের মৃত্যুসনদে মৃত্যুর কারণ হিসেবে হাম–পরবর্তী নিউমোনিয়া, রক্তে জীবাণুর সংক্রমণ, মস্তিষ্কে সংক্রমণ, রক্তে পটাশিয়ামের ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া তাকরিমের হার্টে ছিদ্র ছিল।
চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন একজন মন্ত্রী
তাকরিমের পিআইসিইউর প্রয়োজন হলে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। হাসপাতালের বিল বাড়তে থাকলে দিশাহারা হয়ে পড়েন বাবা-মা। তাকরিমের বাবা-মা গত মঙ্গলবার একাত্তর টিভিকে জানিয়েছিলেন, চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার বিনিময়ে কেউ যদি তাকরিমকে নিয়ে নিতে চান, তা–ও তাঁরা দিতে রাজি আছেন। তাঁরা শুধু চান তাঁদের সন্তান বেঁচে থাকুক। বেসরকারি টেলিভিশনের এই প্রতিবেদন দেখে তাকরিমের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তাঁর একজন প্রতিনিধি হাসপাতালে গিয়ে চার লাখ টাকার বেশি বিল পরিশোধ করেন এবং পরিবারকে নগদ আরও এক লাখ টাকা দেন।
শিশুটির বাবা মহসীন বলেন, মন্ত্রী চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেও ছেলেকে তো বাঁচানো গেল না। মহসীন অটোরিকশা চালান। বিদেশ যাওয়ার জন্য অনেক টাকা খরচ করেছেন। তাঁর বড় মেয়ের বয়স তিন বছর। এত চেষ্টার পরও সন্তানকে বাঁচাতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে বাবা-মা বেলা আড়াইটার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠেন। ছেলের মরদেহ নিয়ে ভোলার পথে রওনা দেন তাঁরা।






