জিনস প্যান্টের পকেটের কোণে যে ছোট ছোট ধাতব বোতামগুলো দেখা যায়, অনেকে সেগুলোকে শুধু নকশা মনে করেন। কিন্তু এদের পেছনে লুকিয়ে আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এবং জিনসের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত গল্প।
জিনস বা ডেনিম প্যান্টের এই ধাতব বোতামগুলোর উদ্দেশ্য বোঝার জন্য জানতে হবে জিনসের উৎপত্তি। আজকের স্টাইলিশ জিনস মূলত খনিশ্রমিক ও কঠোর শ্রমের জন্য তৈরি হয়েছিল।
আঠারো শতকে যুক্তরাষ্ট্রে সোনার খনি এবং রেলপথ নির্মাণের কাজ ব্যাপকভাবে শুরু হয়। তখন শ্রমিকরা একটি বড় সমস্যায় পড়েন। খনির কঠিন পরিবেশ এবং দীর্ঘক্ষণের পরিশ্রমে সাধারণ প্যান্টগুলো দ্রুত ছিঁড়ে যেত। তাই দরকার ছিল এমন একটি টেকসই পোশাকের, যা সহজে নষ্ট না হয়।
এই সমস্যার সমাধান এনেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কাপড় ব্যবসায়ী লিভাই স্ট্রাউস। তিনি দেখেন, সাধারণ সুতি বা লিনেনের প্যান্ট খনির পরিবেশ সহ্য করতে পারে না। তাই তিনি ফ্রান্সের নিম শহরের শক্ত সুতার কাপড় ‘সার্জ দে নিম’ দিয়ে প্যান্ট তৈরি করেন। এই নাম থেকেই পরে ‘ডেনিম’ শব্দটি উদ্ভূত হয়। ১৮২৯ সালের দিকে লিভাই স্ট্রাউস যুক্তরাষ্ট্রে এই প্যান্ট বিক্রি শুরু করেন।
অন্যদিকে, জিনস নামটি এসেছে ইতালির জেনোয়া শহর থেকে। সেখানকার কাপড় নীল রঙ করে জাহাজের পাল বা কাজের পোশাক তৈরিতে ব্যবহার হতো। ফরাসিরা এটাকে বলত ‘ব্লু দে জেনেস’, যা থেকে ‘ব্লু জিনস’ নামটি এসেছে।
প্রথমদিকে জিনসগুলো ছিল ঢিলেঢালা এবং নীল রঙের। নীল ইন্ডিগো ডাই কাপড়ের উপরের স্তরে লেগে থাকত, ফলে বারবার ধোয়ার পরও সুতো মজবুত থাকত। তাই বেশিরভাগ জিনস নীল রঙের।
জিনসের পকেটের কোণায় যে ধাতব বোতামগুলো থাকে, সেগুলোকে বলে ‘রিভেট’। খনি বা কারখানায় কাজ করা শ্রমিকদের পকেটের কোণা এবং জয়েন্টস্থল দ্রুত ছিঁড়ে যেত। ১৮৭১ সালে নেভাডা শহরের দরজি জ্যাকব ডেভিস এর সমাধান খুঁজে পান। তিনি দুর্বল জায়গায় হাতুড়ি দিয়ে তামার রিভেট বসিয়ে জোড়া লাগান, যা সেলাইয়ের চেয়ে অনেক বেশি টেকসই করে।
এভাবে জন্ম নেয় ‘রিভেটেড ব্লু জিনস’, যা ‘XX’ নামে পরিচিত ছিল এবং পরে ‘৫০১ জিনস’ হিসেবে বিখ্যাত হয়। এই রিভেট পকেট ফেটে যাওয়া ঠেকাতে ম্যাজিকের মতো কাজ করত। জ্যাকব ডেভিসের এই প্যান্ট দ্রুত জনপ্রিয় হয় এবং অন্যরাও নকল করতে শুরু করে।
জ্যাকব ডেভিস তার আইডিয়ার পেটেন্ট করতে চান, কিন্তু ৬৮ ডলার খরচের অভাবে পারেন না। ১৮৭২ সালে তিনি লিভাই স্ট্রাউসের সঙ্গে চুক্তি করেন। স্ট্রাউস খরচ দেন এবং সান ফ্রান্সিসকোতে উৎপাদন তদারকি করেন ডেভিস। ১৮৭৩ সালের ২০ মে তারা যৌথভাবে পেটেন্ট পান।
১৮৯০ সাল পর্যন্ত লিভাই স্ট্রাউস অ্যান্ড কো.–এর একচ্ছত্র অধিকার ছিল। পেটেন্ট শেষ হওয়ার পর সব কোম্পানি রিভেট ব্যবহার শুরু করে। পরে লিভাইস তাদের ট্রেডমার্ক যেমন দুই ঘোড়ার লেবেল, লাল ট্যাব ইত্যাদি সুরক্ষিত করে।
আজ আর খনির জন্য রিভেটের দরকার নেই, তবু জিনসের পকেটে এটি রয়ে গেছে। রিভেট ছাড়া জিনস অসম্পূর্ণ, এমনকি অনেকে এটি ছাড়া জিনসকে নকল মনে করেন।
সূত্র: ইয়াহু লাইফস্টাইল, ফাইভ পকেট জিনস, সিএনএন, বিজনেস ইনসাইডার






