পড়াশোনার পাশাপাশি পোশাক কারখানায় শ্রমিকের কাজ করে জমানো টাকায় মো. মোকছেদুল ইসলাম শখের আঙুর চাষ শুরু করেন। ফেসবুক ও ইউটিউবের ভিডিও দেখে বিদেশি ফলের চাষপদ্ধতি শিখে এখন তাঁর বাগানে থোকায় থোকায় ঝুলছে অন্তত ২০ জাতের আঙুর।

মো. মোকছেদুল ইসলামের বাড়ি ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার মল্লিকবাড়ি গ্রামে। তাঁর বাগানের বিভিন্ন জাতের আঙুর দেখতে আশপাশের লোকজন ভিড় করছেন। তাঁর সাফল্য দেখে অনেকে আঙুর চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন। এ বছর কামিল (মাস্টার্স) পরীক্ষা দিয়েছেন মোকছেদুল। তাঁর বাবা খুরশেদ আলম স্থানীয় মসজিদের ইমাম। ছোটবেলা থেকেই কৃষিকাজে যুক্ত মোকছেদুল ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। সেখানকার বেতন জমিয়ে বাড়ির পাশে বাণিজ্যিক আঙুরবাগান গড়ে তুলেছেন।

মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে মল্লিকবাড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, মোকছেদুলের বাড়ির সামনে সাইনবোর্ড রয়েছে। পাকা সড়কের পাশে আঙুরের মাতৃবাগান, যেখান থেকে বিভিন্ন জাতের চারা তৈরি হয়। বাড়ির পেছনের ১৪ শতক জমিতে ১৮০টি চারা রোপণ করে বাগান তৈরি করেছেন। সেখানে সবুজের মাঝে টসটসে আঙুর ঝুলছে। বাগানে গাছের পরিচর্যা করছিলেন মোকছেদুল।

বাগান ঘুরে তিনি ভ্যালেজ, ডিক্সন, গ্রিন লং, একেলো, ব্লাক রুবি, বাইকুনুর, সামার ব্লাকসহ অন্তত ২০ জাতের আঙুরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘মানুষের মুখে শুনতাম আঙুর ফল টক হয়। শখের বসে প্রথমে এক–দুইটা গাছ লাগাই ২০২২ সালে। দেশীয় গাছ দুটিতে ফলন এলে সেটি কিছুটা মিষ্টতা পাওয়া যায়। তারপর আঙুর মিষ্টি করা সম্ভব কি না বা মিষ্টি জাতের আঙুর আছে কি না, এ নিয়ে আমি ফেসবুক ও ইউটিউব সাইটে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করি। তখন ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ দেখে আঙুর চাষের কৌশল ও পরিচর্যা দেখি।’

বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে ২০ জাতের আঙুরের চারা সংগ্রহ করেন মোকছেদুল। বাড়ির সামনে লাগানোর পর ফল আসে এবং মিষ্টতাও বাড়ে। এলাকার লোকজন আঙুরের প্রশংসা করায় বাণিজ্যিক চাষের পরিকল্পনা নেন। গত বছর ১৮০টি চারা রোপণ করেন এবং এ বছর ফলন হয়েছে।

বাগানে অন্তত ২০ জাতের আঙুর রয়েছে বলে মোকছেদুল জানান, ‘বিদেশি জাতের আঙুরগুলোর চারা সংগ্রহের পর নিজে চারা তৈরির কৌশল শিখে চারা উৎপাদন করে সেই চারা দিয়ে বাগান করেছি। ইন্দোনেশিয়ান একজন বাগানিকে ফলো করে আমি চারা উৎপাদন প্রযুক্তি সম্পর্কে শিখেছি। ভিডিও দেখে দেখে নিজে চেষ্টা করে সফল হয়েছি। আশা করছি, আঙুর নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।’

২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত আঙুর চাষে প্রায় ৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান মোকছেদুল। এর টাকা জোগাতে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পোশাক কারখানায় কাজ করেছেন। এ বছর বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়েছে। আশা করছেন, ৪০০-৫০০ টাকা কেজি দরে আঙুর বিক্রি করে দেড় লাখ টাকার বেশি আয় হবে। প্রতিটি গাছের চারা ৪০০-৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা থেকে আরও আয় আসবে।

আঙুর চাষের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘ফল যখন পাকা শুরু করে তখন অতিমাত্রায় বৃষ্টি হলে ফলের মধ্যে পচন আসে। এ জন্য বহির্বিশ্বে বিভিন্ন উন্নত প্রযুক্তিতে চাষগুলা দেখি তারা পলি নেট ব্যবহার করে। তা যদি আমরা এ রকম করতে পারি তাহলে আমাদের বাংলাদেশে আসলে এ রকম ভালো ফলন হওয়া সম্ভব এবং এটা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করে বিদেশে রপ্তানি করতে পারব।’

বাগানে নিয়মিত তদারকি করেন স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. রাশেদুজ্জামান। তিনি বলেন, আঙুর একটি সম্ভাবনাময় ফসল। ১৪ শতক জমিতে ২০০ আঙুরে চারা লাগিয়ে তরুণ উদ্যোক্তা মোকছেদুল তা সম্ভব করে ফেলেছেন। বাগানে ফলনও ভালো হয়েছে। কৃষি বিভাগ থেকে তাঁকে নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যে আঙুর বাজার থেকে কিনি, সেগুলো বিদেশ থেকে আসে। এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা যায়। সে ক্ষেত্রে আমরা দেশীয়ভাবে আঙুর চাষ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রাও রক্ষা করা সম্ভব।’

মল্লিকবাড়ির মোহাম্মদ আলম মিঞা বাগান দেখতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এত সুন্দর আঙুর দেখে খুব ভালো লাগছে। অনেক জাতের আঙুর দেখলাম ও খাওয়ার সুযোগ হলো।’ স্থানীয় বেসরকারি সংস্থার কর্মী মো. শাহীনুর আলমও বলেন, ‘বাগানে এসে আঙুর ফল খাইলাম, অনেক সুস্বাদু এবং অনেক মিষ্টি। দেশে এমন আঙুর হইতে আমি ইতিপূর্বে আর দেখি নাই। চাকরিজীবন শেষে অবসরে যাওয়ার পর নিজেও একটি আঙুরবাগান করব।’

এর আগে ভালুকার কৈয়াদি গ্রামে গত বছর এক তরুণ উদ্যোক্তা বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান। ভালুকার মাটি ফল চাষের জন্য উপযোগী এবং আঙুর মিষ্টি হওয়ায় এখানে সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, আঙুর চাষে আগ্রহীদের চারার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন এবং প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। আঙুর একটি বিদেশি ফল। সংরক্ষণ ও মিষ্টতা বাড়ানোর বিষয়ে কৃষিবিজ্ঞানীরা কাজ করলে দেশের জন্য ভালো ফল হবে।