• দুই মাসে তদন্ত শেষের ঘোষণা দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

  • তবে তদন্ত শেষ হয়নি, আরও সময় নিতে চায় পুলিশ।

.

মুক্তকণ্ঠ ভবনে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের চার মাস পার হলেও ঘটনার নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী বা সমন্বয়কারীরা এখনো চিহ্নিত হয়নি। সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া ও অনলাইনে উসকানি দেওয়া অনেককে শনাক্ত করার কথা বলছে পুলিশ। তবে হামলার ছক কারা কষেছিল, কত দিন ধরে প্রস্তুতি চলছিল, এতে অর্থ বা রাজনৈতিক সহায়তা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

মামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বলছে, তারা সরাসরি হামলাকারীদের পাশাপাশি উসকানিদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখছে। এ কারণে তদন্ত শেষ করতে আরও সময় লাগছে। ফলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ঘোষিত দুই মাসের সময়সীমার মধ্যে মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর মধ্যরাতে ঢাকার কারওয়ান বাজারে মুক্তকণ্ঠ ভবনে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে সংঘবদ্ধ একটি গোষ্ঠী। একই রাতে ফার্মগেটের কাছে দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে ও ধানমন্ডিতে ছায়ানট ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়।

.আক্রান্ত মুক্তকণ্ঠ, ছবিতে হামলাকারীদের মুখ স্পষ্ট.

ওই হামলার দুই মাস পর ২৮ ফেব্রুয়ারি মুক্তকণ্ঠ ভবনে ধ্বংসযজ্ঞ পরিদর্শনে আসেন নবগঠিত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সেদিন তিনি বলেছিলেন, দুই মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। ঘোষিত সেই সময়সীমা আজ ২৮ এপ্রিল শেষ হচ্ছে।

তবে তদন্তকারী সংস্থা এখনো অভিযোগপত্র দেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। সরাসরি হামলাকারী ও অনলাইনে উসকানিদাতাদের বিষয়ে কিছু অগ্রগতি থাকলেও তদন্ত এখনো নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা বা সমন্বয়কারীদের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

.
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর মধ্যরাতে ঢাকার কারওয়ান বাজারে মুক্তকণ্ঠ ভবনে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে সংঘবদ্ধ একটি গোষ্ঠী। একই রাতে ফার্মগেটের কাছে দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে ও ধানমন্ডিতে ছায়ানট ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়।
.

ঘটনার পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পুলিশ ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করে। এরপর ৩ এপ্রিল এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় আতাউর রহমান বিক্রমপুরীকে। তাঁকে এর আগে গত বছর ২৩ ডিসেম্বর আটক করে জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি বিবেচনায় ডিটেনশন দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছিল সরকার।

এরপর ৯ এপ্রিল আদালতের মাধ্যমে আরও ১১ জনকে মুক্তকণ্ঠের মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। তাঁরা এর আগে ডেইলি স্টার-এর কার্যালয়ে হামলার মামলায় গ্রেপ্তার ছিলেন। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত মুক্তকণ্ঠ ভবনে হামলা মামলায় গ্রেপ্তার আসামির সংখ্যা ৩৮। তাঁদের ১০ জন ইতিমধ্যে জামিনে মুক্ত হয়েছেন, যাঁরা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

.মুক্তকণ্ঠ কার্যালয়ে হামলা: মামলায় আসামি ৪০০–৫০০.

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার আসামিদের বাইরে আরও কিছু হামলাকারীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে রাখায় তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কয়েকজনের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে পরিচয় জানতে মেটা কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখেছে তদন্তকারী সংস্থা।

.

তদন্তের বিষয়ে যতটা খবর পাওয়া যাচ্ছে, হামলার দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা লাইভ, আপলোড করা ভিডিও ও ছবিকেন্দ্রিক অনুসন্ধানে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কারা পরিকল্পনা করেছে, কত দিন ধরে প্রস্তুতি চলছিল, কারা এতে সহায়তা ও সমন্বয় করেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও তদন্তকারী সংস্থা ডিবির প্রধান শফিকুল ইসলাম গত রোববার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, হামলার ঘটনার সংগৃহীত ফুটেজ ও ছবি সংগ্রহ করে সরাসরি আক্রমণে জড়িত অনেককে চিহ্নিত করা হয়েছে। উসকানিদাতাদেরও চিহ্নিত করা গেছে। প্রাপ্ত তথ্য যাছাই-বাছাই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ মামলা। এর আইনি প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতে তদন্তে আরও সময় দরকার। এ কারণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঘোষিত সময়ের মধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়া যাচ্ছে না।

পরিকল্পনাকারীদের কেউ এখন পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছে কি না—জানতে চাইলে ডিবির প্রধান বলেন, সে বিষয়েও তদন্ত চলছে। বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

.
তদন্তের বিষয়ে যতটা খবর পাওয়া যাচ্ছে, হামলার দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা লাইভ, আপলোড করা ভিডিও ও ছবিকেন্দ্রিক অনুসন্ধানে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কারা পরিকল্পনা করেছে, কত দিন ধরে প্রস্তুতি চলছিল, কারা এতে সহায়তা ও সমন্বয় করেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
.

জামিন করানোর দাবি ফেসবুক পোস্টে

২৪ এপ্রিল সকাল ৬টা ১৯ মিনিটে আলতাফ হোসেন নামের এক ব্যক্তি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘মুক্তকণ্ঠের মামলায় ওই সময়ে গ্রেপ্তারকৃত আটজনের মধ্যে সবাই জামিনে আছেন। ছয়জনের জামিন করিয়েছে বৈষম্যহীন কারামুক্তি আন্দোলন। যেহেতু মুক্তকণ্ঠের মামলা ছিল, তাই নিরাপত্তার ইস্যু চিন্তা করে খোলাসা করিনি। এখন সাতজনই বাইরে আছেন, একজনকে পুনরায় ডেইলি স্টার-এর মামলায় অ্যারেস্ট দেখানো হইসে। নতুন করে চারজনকে অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছিল দুসপ্তাহ আগে, তাদের মামলাগুলো আমরা দেখছি। নতুন করে যুক্ত হলো বিক্রমপুরী ভাইয়ের নাম।’

.

পুলিশ সূত্র জানায়, উগ্রবাদ, নিষিদ্ধ জঙ্গিগোষ্ঠী বা হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার আসামিদের মুক্তির দাবিতে ‘বৈষম্যহীন কারামুক্তি আন্দোলনের’ ব্যানারে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পরপর বিভিন্ন কারাগারের সামনে বিক্ষোভ ও ‘মব’ করার চেষ্টা হয়েছিল। তারা কিছু সভা-সমাবেশ করেছে।

.
হামলার ঘটনার সংগৃহীত ফুটেজ ও ছবি সংগ্রহ করে সরাসরি আক্রমণে জড়িত অনেককে চিহ্নিত করা হয়েছে। উসকানিদাতাদেরও চিহ্নিত করা গেছে। প্রাপ্ত তথ্য যাছাই-বাছাই করা হচ্ছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও তদন্তকারী সংস্থা ডিবির প্রধান শফিকুল ইসলাম
.

পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ফেসবুকে ‘বৈষম্যহীন কারামুক্তি আন্দোলন’ নামের পেজটিতে ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট থেকে নিয়মিত পোস্ট দেওয়া হচ্ছে। আলতাফ হোসেনও এই পেজে সক্রিয়। এর বাইরে আরও কিছু ব্যক্তি এই পেজে সক্রিয়। তাঁদের কারও কারও বিরুদ্ধে অতীতে উগ্রবাদে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। কেউ কেউ অতীতে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন।

এই ফেসবুক পেজে মুক্তকণ্ঠের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অপপ্রচারও দেখা গেছে। ‘বৈষম্যহীন কারামুক্তি আন্দোলন’ শীর্ষক ব্যানারে মুক্তকণ্ঠ ও ডেইলি স্টার বন্ধের দাবিতে সমাবেশের ডাক দিয়ে ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর একটি পোস্ট দেওয়া হয়। ওই কর্মসূচি হয়েছে জানিয়ে এর দুই দিন পর (৯ নভেম্বর) ব্যানারসহ কিছু ব্যক্তির ছবিসহ আরেকটি পোস্ট দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, শফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মাওলানা আলতাফ হোসেন, মাওলানা ইসহাক খানসহ একাধিক নেতা। এরপর ২৪ নভেম্বর মুক্তকণ্ঠ কার্যালয়ের সামনে গরু জবাইসহ বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করে সংঘবদ্ধ একটি গোষ্ঠী। সেটাও প্রচার করে একই পেজে। ওই ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের ছাড়িয়ে নেওয়ার খবর দিয়ে ২৫ নভেম্বর আরেক পোস্টে বলা হয়, ‘কারামুক্তি আন্দোলনের অবিরাম প্রচেষ্টা, অবস্থান ও সাংবাদিক ইলিয়াস ভাইয়ের সহযোগিতা, আহমাদ রফিক ভাইয়ের দিক-নির্দেশনাসহ অন্যান্য সর্বসাধারণ ও আন্দোলনকারীদের চাপে গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচ ভাই মুক্ত হয়েছেন।’ এ ছাড়া বিদেশে থাকা এক ইউটিউবারের উসকানিমূলক ভিডিও এই পেজে প্রচারিত হয়েছে।

.

হাদির মৃত্যুকে ‘উপলক্ষ’ হিসেবে ব্যবহার

গুলিবিদ্ধ ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মুক্তকণ্ঠের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে উসকানি, গুজব ছড়িয়ে হামলার জন্য আহ্বান জানায় স্বার্থান্বেষী একটি গোষ্ঠী। তাদের একটি দল শাহবাগে সংগঠিত হয়ে প্রথমে রাত ১১টার দিকে কারওয়ান বাজারে মুক্তকণ্ঠের কার্যালয়ের সামনে এসে নানা স্লোগান দিতে থাকে।

এরপর রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে শাহবাগ থেকে সংঘবদ্ধ আরেকটি দল মুক্তকণ্ঠ ভবনের সামনে আসে। এসেই তারা ভবনের ফটকের শাটার ভেঙে ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। হামলাকারীদের একটি অংশ আগুন নেভাতে আসা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি মূল সড়কে আটকে দেয়।

ওই সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও তাঁরা নিষ্ক্রিয় ছিলেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন। ততক্ষণে পুরো ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পুড়ে ছাই হয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, আসবাব, কম্পিউটার, টেলিভিশনসহ নানা সরঞ্জাম।

.
এরপর রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে শাহবাগ থেকে সংঘবদ্ধ আরেকটি দল মুক্তকণ্ঠ ভবনের সামনে আসে। এসেই তারা ভবনের ফটকের শাটার ভেঙে ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। হামলাকারীদের একটি অংশ আগুন নেভাতে আসা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি মূল সড়কে আটকে দেয়।
.

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী একাধিক বাহিনী ও সংস্থা-সংশ্লিষ্ট সূত্র মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছে, উগ্রপন্থী একটি গোষ্ঠী ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির মৃত্যুকে ‘উপলক্ষ’ হিসেবে ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে মুক্তকণ্ঠ ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে আক্রমণ করিয়েছে। একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ওই রাতে ছায়ানটে এবং পরদিন উদীচী কার্যালয়ে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়।

এর আগে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বার্থান্বেষী ও চিহ্নিত একটি গোষ্ঠী মুক্তকণ্ঠের বিরুদ্ধে আবার ব্যাপক মাত্রায় অপপ্রচার শুরু করে।

.

দুই ইউটিউবারের প্ররোচনা

অনেক দিন ধরে ধারাবাহিকভাবে মুক্তকণ্ঠের বিরুদ্ধে অনলাইনে প্রচারণা ও উসকানি দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অগ্রভাগে ছিলেন বিদেশে অবস্থানরত ইউটিউবার পিনাকী ভট্টাচার্য ও ইলিয়াস হোসেন। তাঁরা অনেক দিন ধরে হামলার উসকানি দিয়ে আসছিলেন। তাঁদের বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিও তদন্ত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পর্যালোচনা করছেন। তদন্ত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, এ ধরনের প্রচারণা দেশের ভেতরে থাকা একটি উগ্র গোষ্ঠীকে উৎসাহিত করেছে।

এঁদের প্ররোচনায় এর আগে ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর মুক্তকণ্ঠের কার্যালয়ের সামনে গরু জবাই এবং কয়েক দিন ধরে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে উগ্র একটি গোষ্ঠী।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, ওই সময় থেকে মুক্তকণ্ঠকে লক্ষ্যবস্তু করে একটি গোষ্ঠী প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনাকে তারা মুক্তকণ্ঠতে চূড়ান্ত হামলার মোক্ষম সময় হিসেবে বেছে নেয়। এ ক্ষেত্রে উগ্রপন্থী একটি গোষ্ঠীর পাশাপাশি ইসলামী ছাত্রশিবিরের কিছু সাবেক ও বর্তমান নেতা-কর্মীর অনলাইন তৎপরতাও পর্যালোচনায় আছে। তাঁদের অপপ্রচারের মূল লক্ষ্য ছিল মুক্তকণ্ঠ ও ডেইলি স্টার-এর ওপর হামলার ন্যায্যতা সৃষ্টি করা।

.
এঁদের প্ররোচনায় এর আগে ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর মুক্তকণ্ঠের কার্যালয়ের সামনে গরু জবাই এবং কয়েক দিন ধরে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে উগ্র একটি গোষ্ঠী।
.

ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ইউটিউবার ইলিয়াস হোসেন একাধিক পোস্ট দেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। মুক্তকণ্ঠতে আক্রমণের পর এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘মুক্তকণ্ঠের একটা ইটও যেন না থাকে।’ আরেক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘সবাই মুক্তকণ্ঠ কার্যালয়ে আসেন। অর্ধেক কাজ শেষ। বাকিটা আপনারা করেন।’

মুক্তকণ্ঠ ভবনে পুরোপুরি আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর ইলিয়াস আক্রমণকারীদের উদ্দেশে এক পোস্টে লেখেন, ‘মুক্তকণ্ঠ ডান (হামলা সম্পন্ন), ডেইলি স্টারে চলে আসেন।’ পরে গভীর রাতে আরেক পোস্টে লেখেন, ‘ডেইলি স্টার ডান, ওয়েলডান বয়েজ।’ ওই রাতে সেনাবাহিনীর উদ্দেশে ইলিয়াস হোসেন ফেসবুকে লেখেন, ‘মুক্তকণ্ঠকে বাঁচাতে ওদের অফিসের সামনে সেনাবাহিনী আসলে ওদেরকে উচিত জবাব দেওয়ার অনুরোধ থাকল।’

এদিকে উগ্রপন্থী হিসেবে পরিচিত আতাউর রহমান বিক্রমপুরীকে ২৩ ডিসেম্বর আটক করে জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি বিবেচনায় তিন মাসের ডিটেনশন দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। আটকের আগে আতাউর রহমান বিক্রমপুরী ফেসবুকে লাইভে এসে বলেছিলেন, মুক্তকণ্ঠ ও ডেইলি স্টার-এ হামলার উসকানি তিনি একা দেননি। তিনি বলেন, ‘আমরা কি উসকানি দিই নাই? হ্যাঁ, আমি সরাসরি মুক্তকণ্ঠ, দিল্লি স্টারকে ভাঙার প্রতি জনগণকে সরাসরি উৎসাহিত না করলেও আকারে–ইঙ্গিতে আমরাও বলেছি বিপ্লবকে পূর্ণ করতে হবে। এনসিপির নেতারা যে পোস্ট দিয়েছে, তাদের মতো করে ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট আমিও দিয়েছি।’

.

শিবির-সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও উপস্থিতি

মুক্তকণ্ঠ কার্যালয়ে হামলার আগে শিবির-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতা-কর্মী ফেসবুক পোস্ট ও লাইভে মুক্তকণ্ঠ ও ডেইলি স্টারকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন। তাঁদের কেউ কেউ অপপ্রচারের পাশাপাশি মুক্তকণ্ঠ ও ডেইলি স্টার বন্ধ করার আহ্বান জানান।

হামলার দিন পাওয়া ভিডিও ফুটেজে শিবির-সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত কাউকে কাউকেও দেখা গেছে। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হল ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম। মধ্যরাতে ঘটনাস্থলে হামলাকারীদের সঙ্গে তাঁর উপস্থিতির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল।

১৮ ডিসেম্বর ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর আসার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সমাবেশে ওই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘যারা মিডিয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে নরমালাইজ করতে চায়, মিডিয়াকে ঘেরাও করতে হবে। আগামীকাল বাম, শাহবাগী, ছায়ানট, উদীচীকে তছনছ করে দিতে হবে।’ (সূত্র: আজকের পত্রিকা, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫)

একই দিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সমাবেশে শিবিরের সভাপতি ও রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘এই প্রোগ্রাম থেকে ঘোষণা দিচ্ছি, মুক্তকণ্ঠ, ডেইলি স্টারসহ এই সব সুশীল সংবাদপত্রকে অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।’ (সূত্র: আমাদের সময়, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫)

যদিও প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। কিন্তু হামলার উসকানিদাতা শিবিরের নেতাদের বিষয়ে কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

.
রাত ১১টা ৮ মিনিটে শাহবাগ থেকে প্রথম ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল কারওয়ান বাজারের দিকে রওনা হয়। রাত ১১টা ১৫ মিনিটে তারা বাংলামোটরে পৌঁছায়। তখন মুক্তকণ্ঠ কার্যালয়ের সামনে ১২-১৩ জন পুলিশ সদস্য অবস্থান করছিলেন।
.

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা

গুজব ছড়ানো থেকে শুরু করে অগ্নিসংযোগ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে মুক্তকণ্ঠের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু সরকার পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়নি। ঘটনাস্থলে উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা হামলা ঠেকানোর চেষ্টা করা তো দূরের কথা, তাদের সামনেও যায়নি।

শুরুতে পুলিশের সংখ্যা কম থাকলেও পরে পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনীসহ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি বাড়ে। কিন্তু হামলাকারীদের বাধা দেওয়া বা আটকের চেষ্টা দেখা যায়নি। আগুন দেওয়ার প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশে সহায়তা করে সেনাবাহিনী।

রাত আটটার দিকে ওসমান হাদির মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে। রাত ৮টা ২৬ মিনিটে মুক্তকণ্ঠের পক্ষ থেকে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনারের (ডিসি) কাছে নিরাপত্তা চেয়ে যোগাযোগ করা হয়। রাত ১০টার পর সরকার হাদির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। শাহবাগে লোক জড়ো হচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার উসকানি দেওয়া হচ্ছে—এই খবর পুলিশকে জানানো হয় এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের অনুরোধ করা হয়। রাত ১১টার পরপর সেনাবাহিনী, র‍্যাব ও ডিএমপি কমিশনারকে পর্যায়ক্রমে অবহিত করা হয়। সবাই বাহিনী পাঠাচ্ছেন বলে জানান। কিন্তু পরের ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায়, আশ্বাসের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক দ্রুত বাড়তে থাকে।

রাত ১১টা ৮ মিনিটে শাহবাগ থেকে প্রথম ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল কারওয়ান বাজারের দিকে রওনা হয়। রাত ১১টা ১৫ মিনিটে তারা বাংলামোটরে পৌঁছায়। তখন মুক্তকণ্ঠ কার্যালয়ের সামনে ১২-১৩ জন পুলিশ সদস্য অবস্থান করছিলেন।

রাত ১১টা ২০ মিনিটে ৫০ থেকে ৬০ জনের দলটি মিছিল নিয়ে প্রগতি ভবনের সামনে আসে। সেখানে পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি হয়। পরে তারা মেট্রোরেল স্টেশনের দিকে গিয়ে মূল সড়কে অবস্থান নেয়। অল্প কিছুক্ষণ পরই তাদের একাংশ মুক্তকণ্ঠ ভবনের সামনে এসে স্লোগান দিতে থাকে। শাহবাগ থেকে মূল আক্রমণকারী দলটি আসে রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে।

.

আটকে দেওয়া হয় ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও

রাত ১২টা ২২ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, তাদের গাড়ি আটকে দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘ব্যাকআপ’ বা নিরাপত্তা সহযোগিতা ছাড়া তাদের পক্ষে এগোনো সম্ভব হচ্ছে না।

এরপরও একাধিকবার যোগাযোগে একই উত্তর পাওয়া যায়। অথচ এ সময় মূল সড়কে পুলিশ, র‍্যাব, সেনাবাহিনী ও বিজিবির গাড়ি উপস্থিত ছিল।

রাত ১টা ২৪ মিনিটে একটি গণমাধ্যমের লাইভ প্রতিবেদনে বলা হয়, অসংখ্য বাহিনীর গাড়ি থাকলেও তারা কোনো অ্যাকশনে যায়নি। রাত ১টা ২৬ মিনিটে সেনাসদস্যদের কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউর ফার্মগেটমুখী সড়কের পাশ থেকে মুক্তকণ্ঠ ভবনের দিকে আসতে দেখা যায়। রাত ১টা ৩১ মিনিটে তারা ভবনের সামনে অবস্থান নেয় এবং লোকজন সরাতে শুরু করে। রাত ২টা ১৩ মিনিটে ফায়ার সার্ভিস জানায়, তারা ‘ক্লিয়ারেন্স’ পেয়েছে। রাত ২টা ৩০ মিনিটে অগ্নিনির্বাপণ কাজ শুরু হয়। রাত ৩টা ৪৮ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার কথা জানানো হয়।

.
ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একযোগে অপপ্রচার-উসকানি, মিথ্যা বয়ান তৈরি এবং সর্বশেষ দ্রুততম সময়ে সংগঠিত হয়ে একই রাতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা—মুক্তকণ্ঠ, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটে আক্রমণ; সবই যেন আগে থেকে ছকে কষা ছিল।
.

সবই যেন ছকে কষা

২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর ঢাকায় ‘মব ভায়োলেন্সে আক্রান্ত বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবাদ সভায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, মুক্তকণ্ঠ ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা ও আগুন দেওয়ার পুরো ঘটনাটাই পরিকল্পিত। শরিফ ওসমান হাদির একটা অ্যাকসিডেন্ট (খারাপ খবর) হতে পারে এবং হওয়ার পর কী কী ঘটনা ঘটানো হবে বাংলাদেশে, এটার একটা চক্রান্ত পরিকল্পনা আগে থেকেই তৈরি হয়েছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনার পরে আমরা বলেছি যে সরকারের ভেতরের একটা অংশের এখানে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সমাজে এটার পক্ষে সম্মতি তৈরি করা হয়েছিল অনেক দিন ধরেই এবং এটার সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যাকআপও আছে। এই তিনটা ঘটনা একসঙ্গে না ঘটলে এত বড় সাহস সেই রাতে কারও পক্ষে করা সম্ভব হতো না।’

হামলার আগে-পরের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে নাহিদের এই বক্তব্যের যৌক্তিকতা পাওয়া যায়। ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একযোগে অপপ্রচার-উসকানি, মিথ্যা বয়ান তৈরি এবং সর্বশেষ দ্রুততম সময়ে সংগঠিত হয়ে একই রাতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা—মুক্তকণ্ঠ, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটে আক্রমণ; সবই যেন আগে থেকে ছকে কষা ছিল।

.
মুক্তকণ্ঠ, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটে হামলার ঘটনাগুলো যেহেতু একই রাতে পরপর ঘটেছে, তাতে বোঝা যায় এর পেছনে সমন্বয় ছিল। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সঠিক তদন্ত না হওয়ার পেছনে কিছু রাজনৈতিক কারণ নিঃসন্দেহে ছিল।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক
.

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে উসকানিদাতা ব্যক্তিদের পেছনে একাধিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ও উগ্রপন্থী শক্তি এবং অর্থদাতা ও প্রচার সহযোগী থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এদের ব্যাপারে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ হাজির করার জন্য সমন্বিত কার্যক্রম দরকার। সে জন্য সরকারের সদিচ্ছা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে নির্দেশনা জরুরি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন।

পরিকল্পিত হামলার প্রশ্নে আইনজীবী ও বিশ্লেষকেরাও সঠিক তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মুক্তকণ্ঠ, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটে হামলার ঘটনাগুলো যেহেতু একই রাতে পরপর ঘটেছে, তাতে বোঝা যায় এর পেছনে সমন্বয় ছিল। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সঠিক তদন্ত না হওয়ার পেছনে কিছু রাজনৈতিক কারণ নিঃসন্দেহে ছিল।

জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী মনে করেন, বর্তমান সরকার এ ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিয়ে ঘটনার নেপথ্যের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে তারা ভবিষ্যতে এই সরকারের জন্যও বিপদের কারণ হতে পারে। ফলে এই ঘটনায় দায়ী ব্যক্তি, যারা ঘটনা ঘটিয়েছে ও সমন্বয় করেছে, বর্তমান সরকারের নিজের স্বার্থেই সঠিকভাবে তদন্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।