দমকা বাতাস শুরু হয়েছিল তখন। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পুরো এলাকা ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। যুবদল কর্মী মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন তখন বাজারে ছিলেন। রাত ১০টার দিকে বাজার থেকে দুই কিলোমিটার দূরে বাড়ির পথে রওনা দেন তিনি। আধা কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার পর ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা বেরিয়ে এসে তাঁর পথ রোধ করে দাঁড়ায়। তাঁদের কয়েকজন ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন নাসিরকে। এরপর মাটিতে পড়ে যাওয়া নাসিরকে লক্ষ্য করে বুকে–পিঠে সাত-আটটি গুলি করেন সন্ত্রাসীরা। গুলিবিদ্ধ নাসিরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত ১২টার দিকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
গতকাল রোববার রাত ১০টার দিকে চট্টগ্রামের রাউজানের কদলপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের শমসের পাড়া গ্রামে যুবদল কর্মী মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনকে হত্যা করা হয়। এলাকাবাসী প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে নাসিরকে হত্যার এ বিবরণ জানা গেছে। হত্যাকাণ্ডের ওই স্থানের আশপাশে বেশ কয়েকটি বাড়ি রয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকলেও চাঁদের ফিকে আলোয় পুরো ঘটনাটি দেখেছেন পাশের একটি বাড়ির একজন বাসিন্দা। নাম প্রকাশ না করে মুক্তকণ্ঠের কাছে পুরো ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন তিনি।
এর আগেও নাসির হামলার শিকার হন বলে জানান তাঁর স্বজনেরা। ২০২৫ সালে আরেক দল সন্ত্রাসী কুপিয়ে জখম করেছিল তাঁকে। তখন তিনি দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সম্প্রতি সুস্থ হয়ে গ্রামে ফেরার পর আবারও হামলার শিকার হন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কদলপুর ইউনিয়ন পাহাড় ও টিলাভূমিতে ঘেরা। এখানে পাহাড়ের মাটি কাটা ও ছড়া থেকে বালু উত্তোলন, কাঠ পাচার ও গাছ কাটার মতো অপরাধের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল আওয়ামী লীগের নেতাদের হাতে। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এসবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয় স্থানীয় বিএনপি-যুবদলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে। এর জের ধরে গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তত ৫ থেকে ৭ জনকে গুলি করা হয়। খুন হন নাসির উদ্দিনসহ ৩ জন।
উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে কলদপুর ইউনিয়নের পুরোনো বাজার ইশানভট্টের হাট। এর একপাশে কদলপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ। কলেজের পাশ ধরে আধা কিলোমিটার গেলে শমসের পাড়া গ্রাম। আজ সোমবার দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, গ্রামের পুরুষ মানুষের সংখ্যা কম। গ্রামীণ আরসিসি ঢালাই সড়ক ধরে ধরে যেতে পথে নারী ও শিশুদের জটলা দেখা যায়। সড়কটি ধরে কিছু দূর গেলে একটি সীমানাপ্রাচীর ঘেরা বাড়ি। তার সামনে হেলে পড়া বাঁশের বেড়া। কয়েকজন নারী জানালেন, এই জায়গায় যুবদল কর্মী নাসিরকে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর গুলি করে হত্যা করা হয়।
গ্রামের নারীরা কেউই ভালো করে হত্যাকাণ্ড নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে রাজি হননি। তাঁদের চোখে মুখে এবং কথায় একটা আতঙ্কের ছাপ দেখা গেছে। পুরো গ্রাম ঘুরে মাত্র দুই একজন বয়স্ক পুরুষের দেখা মিলেছে। তাঁরাও কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
ঘটনাস্থলের ৫০০ মিটার দূরত্বে নাসিরের বড় ভাই আকতার হোসেনের নতুন বাড়ি। নাসিরের নতুন ঘর তাঁর ভাইয়ের বাড়ি থেকে আরও দেড় কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের গহিনে। তাই লাশ সেখানে নেওয়া হবে না। লাশ আনা হবে বড় ভাইয়ের বাড়িতে। এরপর শমসের পাড়ায় মাগরিবের নাজের পর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।
আজ দুপুরে নাসিরের ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, লাশ রাখার জন্য বাড়ির উঠানে প্রস্তুতি চলছে। দলে দলে আত্মীয়স্বজনরা আসছেন। তবে কেউ কিছু বলতে চাইছেন না। নাসিরের বড় ভাই আকতার হোসেন ভাইয়ের লাশের অপেক্ষায় দরজার পাশে বসেছিলেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘নাসির রাজনীতি করতেন। রাজনৈতিকভাবে তাঁর শত্রু ছিল, যার কারণে গত এক বছর আগেও হামলা হয়েছিল। কিন্তু তখন বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি। এবার গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে গেলেন। আমার ভাইয়ের ব্যক্তিগত শত্রু নেই, যা ঘটেছে রাজনীতির কারণে ঘটেছে।’
এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, নাসির উদ্দিনও অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে থানায় ৫টি মামলা ছিল। আজ বিকেল পর্যন্ত নাসির হত্যায় মামলা করেনি পরিবার। তবে সন্ধ্যার পরে পরিবারকে থানায় এসে মামলা করতে বলা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে রাউজানের কদলপুরে সন্ত্রাসীদের হাতে মোট তিনজন খুন হন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাঁদের মধ্যে আছেন যুবদল কর্মী মুহাম্মদ সেলিম (৪০), সেলিমর সহযোগী মুহাম্মদ দিদারুল আলম (৩৮) এবং সর্বশেষ মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন (৪৫)। এ ছাড়া এ ইউনিয়নে ৫ থেকে ৭ জন গত ২০ মাসে গুলিবিদ্ধ হয়। অন্তত অর্ধশতাধিকবার গোলাগুলির ঘটনা ঘটে এই ইউনিয়নে, যাঁর কারণে পুরো ইউনিয়নের বাসিন্দারা থাকেন চরম আতঙ্কে।
নিহত ব্যক্তির একমাত্র মেয়ে লাভলী আকতার বলেন, ‘আমার বাবা এক সময়ে প্রবাসী ছিলেন। পরে দেশে এসে বিএনপির রাজনীতি করতেন। গতকাল রাতে গ্রামের এক ব্যক্তির বাড়িতে আগে থেকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান করছিল সন্ত্রাসীরা। বাবা বাজার থেকে ফেরার পথে ওই বাড়ি থেকে বের হয়ে একের পর এক গুলি করে হত্যা করা হয় তাঁকে। বাবার হত্যাকারী কারা, আমরা জানি। তাঁদের ফাঁসি চাই আমরা।’
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সহসভাপতি সাবের সুলতান বলেন, নাসির তাঁদের দলের নিবেদিত কর্মী ছিলেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন। রাউজানে একের পর এক হত্যাকাণ্ড বন্ধে প্রশাসনের প্রতি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কদলপুরে সন্ত্রাসী যুবদলের কিছু কর্মীদের মধ্যে মধ্যে বালু উত্তোলন ও মাটি কাটা, পাহাড় টিলা দখল নিয়ে দ্বন্দ্ব আছে দীর্ঘদিনের। এ কারণে প্রায় এখানে সংঘাত ঘটে। নাসিরের হত্যা সেটিরই অংশ। নাসিরের বিরুদ্ধেও ৫ টি মামলা রয়েছে থানায়। আমরা পরিবারকে মামলা দিতে বলেছি। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছি।’






