হাম শনাক্তের পর্যাপ্ত পরীক্ষা হচ্ছে না। কিটসংকটের কারণে প্রতিদিন স্বল্পসংখ্যক পরীক্ষা হচ্ছে। এতে দেশের হাম পরিস্থিতির সঠিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।

শুধু রাজধানীর মহাখালীতে সরকারের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ল্যাবরেটরিতে হামের পরীক্ষা হয়। দেশে আর কোথাও এমন পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মো. মোমিনুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘দৈনিক তিন-চার শ নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা আমাদের আছে। আমরা এখন প্রতিদিন গড়ে ১২০ বা তার কিছু বেশি নমুনা পরীক্ষা করছি। কিটস্বল্পতার কারণে বেশি পরীক্ষা করা যাচ্ছে না।’

গতকাল রোববার জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাম পরীক্ষার কিট দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। একটি কিটে ৯০ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা যায়। গতকাল দুপুরে তাঁদের কাছে কিট ছিল মাত্র তিনটি। সন্ধ্যায় ৬০টি কিট দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এ ছাড়া ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে কিছু কিট এসেছে। কাগজপত্রের জটিলতায় এগুলো এখনো ছাড় হয়নি।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পদস্থ কর্মকর্তারা বেশ জোর দিয়ে বলছেন, হাম পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তাঁরা সম্ভাব্য সব উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্ট অনেকে বলছেন, রোগ শনাক্তের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি কর্তৃপক্ষের অবহেলা রয়েছে।

.
সারা দেশ থেকে প্রতিদিন হামের উপসর্গ নিয়ে গড়ে ৩০০ রোগীর নমুনা জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে আসছে পরীক্ষার জন্য। রোগীর নাকের শ্লেষ্মা বা গলার লালা নমুনা হিসেবে ব্যবহার করা যায়। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট থেকে দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, ১১ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত আট দিনে ৯৬৫টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৬৪১টি বা ৬৬ দশমিক ৪ শতাংশ নমুনায় হাম শনাক্ত হয়।
.

জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল এ বিষয়ে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এটা কি ভাবা যায় যে কিট না থাকার কারণে পর্যাপ্ত হাম পরীক্ষা হচ্ছে না? এটা কী করে সম্ভব? এটা স্পষ্টভাবে অবহেলার নমুনা, আন্তরিকতার ঘাটতি। পর্যাপ্ত পরীক্ষা না হওয়ার কারণে হামের আসল চিত্র বা পরিস্থিতি আমাদের সামনে নেই। এ অবস্থার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।’

.
এ বছর ১০৪ জনের নমুনা পরীক্ষার জন্য জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ২৮ জনের হাম শনাক্ত হয়। কতজনের নমুনা পরীক্ষা করে ২৮ জন শনাক্ত হয়েছে, তা তিনি জানেন না, তাঁকে জানানো হয়নি।
বরগুনা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক রেজোয়ানুর রহমান
.

সারা দেশ থেকে প্রতিদিন হামের উপসর্গ নিয়ে গড়ে ৩০০ রোগীর নমুনা জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে আসছে পরীক্ষার জন্য। রোগীর নাকের শ্লেষ্মা বা গলার লালা নমুনা হিসেবে ব্যবহার করা যায়। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট থেকে দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, ১১ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত আট দিনে ৯৬৫টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৬৪১টি বা ৬৬ দশমিক ৪ শতাংশ নমুনায় হাম শনাক্ত হয়।

যত নমুনা জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে আসে, তার সব কটির পরীক্ষা হয় না। গতকাল বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এ বছর হামজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ৩১৬ জন ভর্তি হয় এই হাসপাতালে। এর মধ্যে ২৬৬ জনের নমুনা পরীক্ষার জন্য জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়। ১৩৫টি নমুনার পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তাতে ৭৬ জনের হাম ধরা পড়েছে। ১৩১ জনের পরীক্ষার ফল কবে পাবেন, তা তিনি জানেন না।

.

এ বছর বরগুনা জেলায় হামের সংক্রমণ অনেক বেশি দেখা গেছে। বরগুনা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক রেজোয়ানুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এ বছর ১০৪ জনের নমুনা পরীক্ষার জন্য জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ২৮ জনের হাম শনাক্ত হয়। কতজনের নমুনা পরীক্ষা করে ২৮ জন শনাক্ত হয়েছে, তা তিনি জানেন না, তাঁকে জানানো হয়নি।

জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মোমিনুর রহমান বলেন, এই প্রতিষ্ঠানে মোট চারটি ল্যাবরেটরি আছে—পোলিও ও হাম পরীক্ষা ল্যাব, জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা ল্যাব, জনস্বাস্থ্য ল্যাব ও সাধারণ ল্যাব। ব্যাপক আকারে হাম পরীক্ষার দরকার হতে পারে—এমন ধারণা কেউ করেনি। সে কারণে হাম পরীক্ষার কিট সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়নি।

.
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সারা দেশে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হবে। ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত টিকা কার্যক্রম চলবে।
.

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গতকাল ৬০টি কিট দিয়েছে। আগামী সপ্তাহে আরও ১০০ কিট দেবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র গতকাল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ২৩ হাজার ৬০৬ জন রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের হামের উপসর্গ রয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামের রোগী ৩ হাজার ৪৪ জন। পরীক্ষা বেশি হলে রোগীর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৩৬ জনের।

.

আজ সোমবার সারা দেশে শিশুদের হামের টিকা দেওয়া শুরু হবে। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী সব শিশুকে এই টিকা দেওয়া হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সারা দেশে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হবে। ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত টিকা কার্যক্রম চলবে।

তবে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে জানানো হয়েছে, সরকারি ছুটির দিন টিকা কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। নিয়মিত টিকাদান কেন্দ্রের বাইরে টিকা দেওয়া হবে নার্সারি, কিন্ডারগার্টেন, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, মক্তব, এতিমখানা ও শিশু আশ্রমে। এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত পাঁচ বছরের কম বয়সী ছাত্রছাত্রীকে টিকা দেওয়া হবে। এ ছাড়া যেসব শিশু স্কুলে যায় না কিংবা স্কুলে টিকা নেয়নি, তাদের কমিউনিটির নিয়মিত টিকাদান কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হবে।

.

কর্মসূচি চলাকালে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতাল, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের হাসপাতাল এবং সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে স্থায়ী টিকাদান কেন্দ্র পরিচালিত হবে। শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন এসব কেন্দ্র চালু থাকবে। কর্মসূচি চলার সময় এসব কেন্দ্র থেকে রুটিন টিকাও দেওয়া যাবে।

ঝুঁকিপূর্ণ শিশু ও দুর্গম এলাকার জন্য অতিরিক্ত কেন্দ্র করবে বলে জানিয়েছে ইপিআই। এর মধ্যে আছে দোকান বা বাজার, কারখানা, রাইস মিলের মতো স্থানে মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশু, বেদেবহরের শিশু, পথশিশু, হাসপাতালে মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশু, কারাগারে মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশু, যৌনপল্লির শিশু, বস্তির শিশু। প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত টিকা কার্যক্রম চলবে।