ইরান যুদ্ধের কারণে অপরিশোধিত তেল আমদানি আটকে যাওয়ায় উৎপাদনের গতি কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে দেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, হাতে থাকা অপরিশোধিত তেল ফুরিয়ে এসেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আর এক সপ্তাহের মধ্যেই উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত শোধনাগারটি এত দিন মূলত সৌদি আরবের ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড’ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘মারবান ক্রুড’ পরিশোধন করে দেশে ডিজেল, পেট্রল, অকটেনসহ বিভিন্ন জ্বালানি সরবরাহ করে আসছিল। গত মাসে এই দুই দেশ থেকে দুটি জাহাজে তেল আসার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে জাহাজ দুটি আটকে যাওয়ায় উৎপাদনে চাপ বাড়তে থাকে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। উৎপাদন পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘তেল না আসার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে এখনো পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ হয়নি। কয়েক দিনের মধ্যে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করতে হতে পারে।’ তিনি জানান, মালয়েশিয়া থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এখনো নিরাপত্তা জামানত (পিজি) জমা দেয়নি। ফলে এই মাসে নতুন চালান আসা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে আগামী মাসের শুরুতে একটি জাহাজ দেশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
.বিপিসি ও রিফাইনারি সূত্র জানায়, শোধনাগারটির অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার টন। যুদ্ধ শুরুর আগে মজুত ছিল প্রায় দেড় লাখ টন। তবে ১ এপ্রিলের হিসাবে ব্যবহারযোগ্য মজুত নেমে আসে ১৯ হাজার টনে। এর বাইরে প্রায় ৩৩ হাজার টন তেল ছিল, যা স্বাভাবিক অবস্থায় ব্যবহারযোগ্য নয়। এই অংশটি ‘ডেডস্টক’ হিসেবে ধরা হয়। সংকটের মধ্যে ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম)’ প্রকল্পের ট্যাংকে থাকা আরও প্রায় ৫ হাজার টন অপরিশোধিত তেল সম্প্রতি রিফাইনারিতে আনা হয়েছে। এই তেলও ফুরিয়ে গেছে।
বিপিসি ও রিফাইনারির দায়িত্বশীল দুই কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে জানান, রিফাইনারিতে পাঁচটি উৎপাদন ইউনিট রয়েছে। এগুলো হলো ক্রুড অয়েল ডিস্টিলেশন ইউনিট, এসফল্টিক বিটুমিন প্ল্যান্ট, ভিসব্রেকার ইউনিট, ক্যাটালাইটিক রিফরমিং ইউনিট, কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের প্রথম ধাপের কার্যক্রম চলে ক্রুড অয়েল ডিস্টিলেশন ইউনিটে। বাকিগুলোতে চলে উৎপাদনের মূল কার্যক্রম।
জানতে চাইলে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজ মঙ্গলবার দুপুরে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ হয়নি। এখন দিনে গড়ে ১২০ টন পেট্রল ও ১০০ টনের মতো অকটেন উৎপাদন হচ্ছে। ডিজেল ও বিটুমিনও উৎপাদন করা হচ্ছে। এই উৎপাদন সাত দিন পর্যন্ত চলতে পারবে। তবে উৎপাদনের গতি কমাতে হয়েছে। নতুন জাহাজ না আসা পর্যন্ত উৎপাদনের গতি কমই থাকবে। মোরশেদ হোসাইন জানান, ট্যাংকের নিচে থাকা ডেডস্টক থেকেও স্বল্প পরিমাণে তেল নেওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে ২৫ হাজার টন অপরিশোধিত তেল এখনো ব্যবহার করা যাবে।
.জাহাজ আনার চেষ্টা
গত ২ মার্চ সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে তেল নিতে গিয়ে যুদ্ধের কারণে আটকে যায় একটি জাহাজ। ‘নরডিক পলুকস’ নামের ওই জাহাজে ৩ মার্চ অপরিশোধিত তেল তোলা হয়। পরে রওনা দিলেও পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় সেটি আবার রাস তানুরা টার্মিনালে ফিরে যায়। এটি এখনো সেখানেই আটকে আছে।
অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক) থেকেও এক লাখ টন তেল আনার কথা ছিল গত মাসে। এ জন্য ‘এমটি ওমেরা গ্যালাক্সি’ নামের একটি জাহাজের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন। তবে জাহাজ কোম্পানি চুক্তি বাতিল করেছে। জেবেল ধানা বন্দরের পরিবর্তে ফুজাইরা বন্দর থেকে তেল নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে অ্যাডনক। এতে হরমুজ প্রণালি এড়ানো সম্ভব হলেও আমদানি ব্যয় বাড়বে।
পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, এপ্রিলেও রাস তানুরা বন্দর থেকে এক লাখ টন তেল আসার কথা রয়েছে। বিকল্প হিসেবে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল নেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রতি ব্যারেলে শূন্য দশমিক ২৫ ডলার বাড়তি খরচ হবে বলে জানিয়েছেন বিপিসির কর্মকর্তারা।
.বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, আটকে থাকা জাহাজ বিকল্প উপায়ে দেশে আনার চেষ্টা চলছে। তবে যুদ্ধবিরতি হলেও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। এ কারণে কবে তেল আনা সম্ভব হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। পারস্য উপসাগর অঞ্চল থেকে জ্বালানি পরিবহনের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এতে বাংলাদেশের আমদানিও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি হলেও এখনো হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়নি।
.উৎপাদন বন্ধে প্রভাব কতটুকু
উৎপাদন বন্ধ হলে প্রভাব কতটা পড়বে, তা বোঝার জন্য আমদানি-কাঠামোর দিকে নজর দেওয়া যাক। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি ৫০ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা খরচ করে ৬২ লাখ ১৫ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি করেছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ১০ হাজার টন, অর্থাৎ প্রায় ২৪ শতাংশ। বাকি ৭৬ শতাংশই ছিল পরিশোধিত তেল, যা সরাসরি ব্যবহারযোগ্য।
এই বাস্তবতায় দেশের জ্বালানি সরবরাহ এখন অনেকটাই আমদানিনির্ভর পরিশোধিত তেলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ফলে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও তাৎক্ষণিকভাবে ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলের মতো জ্বালানিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম।
তবে রিফাইনারি সূত্র জানায়, এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে প্রায় ৪০ হাজার টন ডিজেল, ১৫ থেকে ২০ হাজার টন পেট্রল ও অকটেন এবং প্রায় ৩০ হাজার টন ফার্নেস তেল উৎপাদন করা যায়। ফলে পেট্রল ও অকটেনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো দেশীয় শোধনাগারের ওপর নির্ভরশীল। এই উৎপাদন দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে পরিবহন ও ভোক্তা পর্যায়ে চাপ তৈরি হতে পারে।
.এই পরিস্থিতিতে সরকার আপাতত আমদানি করা পরিশোধিত তেলের ওপর ভর করেই সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ইতিমধ্যে পরিশোধিত তেল নিয়ে কয়েকটি জাহাজ দেশে এসেছে এবং আরও চালান পথে রয়েছে। বিকল্প উৎস থেকেও সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ডিজেল আমদানির চুক্তি হয়েছে, যা এ মাসেই সরবরাহ শুরু করার কথা। পাশাপাশি অকটেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মাসের শুরুতে ২৫ হাজার টন অকটেন এসেছে, মাসের শেষ দিকে আরও সমপরিমাণ আসার কথা রয়েছে।
অপরিশোধিত তেলের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অপরিশোধিত তেল আনার প্রধান পথ হলো পারস্য উপসাগর। হরমুজ প্রণালি পার হয়েই এ তেল আসে। এখন পর্যন্ত তেল আসেনি। তবে সরকার বিকল্প উপায়ে তেল আনার চেষ্টা করছে।






