১৭ এপ্রিল ৩০ হাজার টন অকটেন নিয়ে আরও একটি জাহাজ দেশে আসার কথা। দেশীয় উৎস থেকেও প্রতিদিন অকটেনের সরবরাহ বাড়ছে। তবু বাজারে অকটেনের সরবরাহ কমে ফিলিং স্টেশনে লাইন দীর্ঘ হয়েছে, মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে।

এ মাসের শুরুতেই অকটেন নিয়ে একটি জাহাজ এসেছে, আরেকটি আসছে। দেশীয় উৎপাদনও বেড়েছে। কিন্তু গত মাসের তুলনায় এপ্রিলে সরবরাহ কমেছে। গত বছরের এপ্রিলের তুলনায়ও সরবরাহ কম। ফলে ফিলিং স্টেশনের লাইন আরও লম্বা হচ্ছে।

জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহের সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা বিপণন কোম্পানি ডিলারদের মাধ্যমে তেল বিক্রি করে। বিপিসির তথ্য অনুসারে, গত বছরের মার্চে প্রতিদিন গড়ে অকটেন বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ১৯৩ টন। এ বছর মার্চে দিনে গড়ে বিক্রি হয়েছে ২৬ টন বেশি। তবে এপ্রিলে বিক্রি কমেছে ৪৯ টন। গত মাসের তুলনায় এ মাসে ৮৩ টন কম বিক্রি হয়েছে।

দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় কখনো এমন পরিস্থিতি দেখতে হয়নি। দেশে যে এত মোটরসাইকেল, এটাও কল্পনায় ছিল না। মূলত পেট্রল-অকটেনের জন্যই ভিড়। এ দুটির সরবরাহ বাড়ানো হলে ভিড় কমতে পারে।

মিজানুর রহমান, পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির সদস্য

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি চাহিদা বেড়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু হলেই তেল নিয়ে আতঙ্ক ছড়ায়। মার্চের শুরুতে পেট্রল ও অকটেনের বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়। মজুত ধরে রাখতে সরকার রেশনিং করে। কয়েকদিন পর রেশনিং তুললেও সরবরাহ গত বছরের মতোই রাখা হচ্ছে।

জ্বালানি বিপণন কোম্পানির দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, পেট্রলপাম্প থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তি চাহিদা আসছে। কিন্তু গত বছর একই দিনে যা নিয়েছে, এবারও তাই দেওয়া হচ্ছে। ফলে কোনো কোনো পাম্প প্রতিদিন তেল পাচ্ছে না। পেট্রল ও অকটেনের সরবরাহ বাড়ালে ভিড় কমবে।

পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির সদস্য মিজানুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় কখনো এমন পরিস্থিতি দেখতে হয়নি। দেশে যে এত মোটরসাইকেল, এটাও কল্পনায় ছিল না। মূলত পেট্রল-অকটেনের জন্যই ভিড়। এ দুটির সরবরাহ বাড়ানো হলে ভিড় কমতে পারে।

জ্বালানি তেলের মজুতে কোনো ঘাটতি নেই। মজুত আরও বাড়ানো হচ্ছে। তাই সরবরাহ কমার কথা নয়, এটি দেখা হবে। আর ভীতি থেকে কেনাকাটা না কমলে মানুষের ভোগান্তি কমবে না।

ইকবাল হাসান মাহমুদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী

পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির একাংশের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, পেট্রলপাম্প চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন।

গতকাল সোমবার বিপিসি পেট্রলপাম্প মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকের পর দুজনের সঙ্গে কথা বলে মুক্তকণ্ঠ। তাঁরা বলেন, পাম্পে সরবরাহ বাড়লে ভিড় কমবে। গত বছরের সঙ্গে তুলনা করে বরাদ্দ সীমিত রাখলে পরিস্থিতি খারাপ হবে। প্রয়োজনে পেট্রল ও অকটেনের দাম বাড়িয়ে সরবরাহ বাড়ানো উচিত। বিপিসির চেয়ারম্যান জ্বালানি বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, জ্বালানি তেলের মজুতে কোনো ঘাটতি নেই। মজুত আরও বাড়ানো হচ্ছে। তাই সরবরাহ কমার কথা নয়, এটি দেখা হবে। আর ভীতি থেকে কেনাকাটা না কমলে মানুষের ভোগান্তি কমবে না।

১১ এপ্রিল দেশে অকটেন বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ১৪৪ টন। পরদিন ১২ এপ্রিল এটি বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ১৭৩ টন। এপ্রিলে এ পর্যন্ত দিনে গড়ে বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ১৩৬ টন। বাজারে তেলের সরবরাহ কমায় ফিলিং স্টেশন থেকে ভিড় কমার কোনো সুযোগ দেখছে না সংশ্লিষ্টরা।

সরকারি শোধনাগারে এখন অকটেন পাওয়া যায় না। বিপিসি চট্টগ্রামের সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেড, পারটেক্স পেট্রো লিমিটেড, নরসিংদীর অ্যাকোয়া রিফাইনারি লিমিটেড ও বাগেরহাটের পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি লিমিটেডসহ চারটি বেসরকারি শোধনাগার থেকে নিয়মিত অকটেন কেনে। গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাসের উপজাত কনডেনসেট শোধন করে তারা জ্বালানি উৎপাদন করে। সরকারি গ্যাস কোম্পানির ফ্রাকসেনেশন প্ল্যান্ট থেকেও অকটেন পায় বিপিসি।

গত বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত দিনে গড়ে তিন তেল কোম্পানির ডিপো থেকে অকটেন বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২১৭ টন। এ বছর মার্চে সরবরাহ বাড়লেও এপ্রিলে কমেছে। ১১ এপ্রিল অকটেন বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ১৪৪ টন, ১২ এপ্রিল ১ হাজার ১৭৩ টন। এপ্রিলে এ পর্যন্ত দিনে গড়ে ১ হাজার ১৩৬ টন বিক্রি হয়েছে। সরবরাহ কমায় ভিড় কমার সম্ভাবনা দেখছে না সংশ্লিষ্টরা।

১২ এপ্রিল বিক্রি শেষে দেশে অকটেনের মজুত আছে ২০ হাজার ১১৮ টন। এটি ১৭ দিনের মজুত। ৩০ হাজার টন অকটেন নিয়ে ১৭ এপ্রিল আরও একটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে।

গত মাসে অকটেন আমদানি হয়নি। জ্বালানি বিভাগের তথ্য বলছে, যুদ্ধ শুরুর পর ৯ এপ্রিল ২৬ হাজার টন অকটেন নিয়ে চট্টগ্রামে একটি জাহাজ আসে। সরকারি-বেসরকারি উৎপাদনকেন্দ্র থেকে এ মাসে প্রতিদিন অকটেন যুক্ত হচ্ছে। ১২ এপ্রিল বিক্রি শেষে অকটেন মজুত ২০ হাজার ১১৮ টন, যা ১৭ দিনের।

বিপিসির দুজন কর্মকর্তা বলেন, মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসে অকটেন ব্যবহৃত হয়। বছরে মোট জ্বালানির ৬ শতাংশ অকটেন। জ্বালানি বিভাগের চাপে তেল কোম্পানি বাড়তি চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে কমিয়ে দিচ্ছে কোথাও কোথাও। অকটেনের ঘাটতি নেই, আরও আমদানি সম্ভব। সরকার চাইলে সরবরাহ বাড়াতে পারে।

বিপিসির তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে ৪ লাখ ১৫ হাজার টন অকটেন বিক্রি হয়েছে। ৫০ শতাংশ দেশীয়, ৫০ শতাংশ আমদানি। এপ্রিলে চাহিদা ৩৭ হাজার টন। এ মাসে আমদানি থেকে ৫৬ হাজার টন ও দেশীয় উৎস থেকে ৩০ হাজার টন যুক্ত হবে। ঘাটতির শঙ্কা নেই।

এখন স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বাড়তি চাহিদা, তাই সরবরাহ কমানোর কোনো সুযোগ নেই। এটি বাড়াতে হবে। গত বছর না নিলেও এবার ঢাকার সব পাম্পেই তেল সরবরাহ করা উচিত। এতে নির্দিষ্ট কয়েকটি পাম্পে ভিড় কমে যাবে। একই সঙ্গে যারা তেল নিচ্ছে, তাদের প্রকৃত চাহিদা মূল্যায়ন করা যেতে পারে।

ম তামিম, জ্বালানিবিশেষজ্ঞ

পেট্রল মোটরসাইকেলে ব্যবহৃত হয়। এ বছর মার্চে দিনে গড়ে পেট্রল বিক্রি ১ হাজার ২৮৫ টন, গত বছর ১ হাজার ৪৯৬ টন। সরবরাহ কমেছে ১৪ শতাংশ বা ২১১ টন। গত বছরের এপ্রিলে ১ হাজার ৩৭৪ টন, এবার ৭ শতাংশ কমে ১ হাজার ২৭১ টন। বর্তমানে ১২ দিনের পেট্রল মজুত। শতভাগ পেট্রল দেশীয়, এ মাসে ঘাটতির শঙ্কা নেই।

জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এখন স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বাড়তি চাহিদা, তাই সরবরাহ কমানোর কোনো সুযোগ নেই। এটি বাড়াতে হবে। গত বছর না নিলেও এবার ঢাকার সব পাম্পেই তেল সরবরাহ করা উচিত। এতে নির্দিষ্ট কয়েকটি পাম্পে ভিড় কমে যাবে। একই সঙ্গে যারা তেল নিচ্ছে, তাদের প্রকৃত চাহিদা মূল্যায়ন করা যেতে পারে।