বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে দস্যু ডাকাতিদের কার্যকলাপ রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জোরদার অভিযান চালাচ্ছে বলে দাবি করছে তারা। কিন্তু গত দেড় বছরে ৬১ জন দস্যু গ্রেপ্তার এবং প্রচুর অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার সত্ত্বেও বনাঞ্চলের জেলে, মৌয়াল ও বাওয়ালিদের মধ্যে আতঙ্ক কমেনি। তারা জানিয়েছেন, নিরাপত্তার অভাব এখনো স্পষ্ট।
২০১৮ সালের নভেম্বরে ৩২টি দস্যু বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সরকার সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক অস্থিরতার পর প্রশাসনিক নজরদারি শিথিল হওয়ায় একাধিক দস্যু চক্র আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
স্থানীয় বনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, এখন সুন্দরবনের নদী-খালে অন্তত ১০–১২টি দস্যু দল কার্যক্রম চালাচ্ছে। তারা নৌকা আটকে জেলেদের বন্দি করে মুক্তিপণ আদায় করছে। আগাম সমঝোতা ছাড়া বনে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
‘ডাকাইতই সুন্দরবনের বাঘ হয়িছে, চুক্তি না করে মৌয়ালদের বনে যাওয়ার উপায় নেই’।
কয়রার কয়েকজন মৌয়াল জানান, নৌকাপ্রতি বিপুল পরিমাণ চাঁদা দিতে হচ্ছে বিভিন্ন দস্যু দলকে। একেকটি নৌকার জন্য কখনো লাখ টাকারও বেশি দিতে হচ্ছে। বিভিন্ন দল আলাদা আলাদা টাকা দাবি করায় খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। এসব অর্থ সরাসরি দস্যুদের কাছে না গিয়ে স্থানীয় কিছু মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে পরিশোধ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বনজীবী বলেন, ‘লোকালয়ে থাকা দস্যুদের সহযোগীদের নাম বললে আমাদের আর কোনো দিন সুন্দরবনে যাওয়া হবে না। মাছ ধরা ও কাঁকড়া সংগ্রহের জন্যও নৌকাপ্রতি অন্তত চার হাজার টাকা দিতে হচ্ছে।’
সাম্প্রতিক সময়ে দস্যু সহিংসতার ঘটনাও বেড়েছে। ৭ এপ্রিল সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বনজীবী আতিয়ার গাজী (৬২) সুন্দরবনের কলাগাছিয়া মুল্লিখালে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। তিনি জানান, চাঁদা না দেওয়ায় ফেরার পথে দস্যুরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর গ্রামের হান্নান সরদারও একই ধরনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ ১০–১২ জন অস্ত্রধারী বনদস্যু আমাকে ঘিরে ফেলে। গাছের সঙ্গে বেঁধে পায়ে গুলি করে। পরে হাঁটুর নিচ থেকে পা কেটে ফেলতে হয়েছে।’
সুন্দরবনে বনদস্যুদের মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেলেন ৬ জেলে, এখনো জিম্মি ৩।
শ্যামনগরের হরিনগর গ্রামের জেলে আবু তাহের বলেন, তিনি ছয় দিন দস্যুদের হাতে বন্দী ছিলেন। তাঁর ভাষ্য, ‘আমরা মাছ ধরছিলাম। হঠাৎ কয়েকজন এসে বন্দুক তাক করে নিজেদের ডন বাহিনী পরিচয় দেয়। আমাদের নিয়ে সীমান্তবর্তী রায়মঙ্গল নদের ভেতরে আটকে রাখে। পরে মাথাপিছু ৪০ হাজার টাকা দিয়ে মুক্তি পাই।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, সুন্দরবনের জটিল ভূ-প্রকৃতি ও দুর্গমতার কারণে অভিযান চালানো অত্যন্ত কঠিন। নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলেও দ্রুত পৌঁছানো এবং গোপনীয়তা রক্ষা করা চ্যালেঞ্জিং। দস্যুরা জঙ্গলের আড়াল থেকে সহজে নজরদারি করতে পারলেও নদী-খাল থেকে বাহিনীর সদস্যদের শনাক্ত করা কঠিন হয়।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম ১ এপ্রিল সাতক্ষীরার শ্যামনগরে মধু আহরণ উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে বলেন, সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে দুর্গম সুন্দরবনে অভিযান চালিয়ে অপরাধ দমন করা শহরের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে করিম-শরীফ, নানা ভাই, ছোট সুমন, আলিফ ও আসাবুর বাহিনীসহ বিভিন্ন দস্যু চক্রের ৬১ সদস্যকে আটক করা হয়েছে। এ সময় ৮০টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৫৯৯টি গুলি উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে ৭৮ জন জেলে ও ৩ পর্যটককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন আজ সোমবার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অভিযান চলছে। এর অংশ হিসেবে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ পরিচালিত হচ্ছে। হারবারিয়া, কৈখালী, কয়রা, নলিয়ান, মান্দারবাড়ি, সাতক্ষীরার শ্যামনগরসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সভাপতি মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, বাস্তবে এখনো সুন্দরবনে দস্যু–আতঙ্ক কমেনি। দস্যুদের ভয়ে অনেক বনজীবী পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। শুধু বনের ভেতরে অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। দস্যুদের অস্ত্র ও অর্থের জোগানদাতাদের বিরুদ্ধেও কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।






