কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে বৈশাখ কোনো উৎসবের সংবাদ নিয়ে আসে না। এখানকার বাসিন্দাদের কাছে এই মাস দমকা হাওয়া, কালো মেঘ এবং সঙ্গে সঙ্গে সব হারানোর ভয় বয়ে আনে। তাঁদের জন্য বৈশাখ মানে কালবৈশাখী ঝড়ে টিকে থাকার কঠিন লড়াই।

জেলা শহর থেকে ব্রহ্মপুত্র নদীতে নৌকায় প্রায় দুই ঘণ্টার পথ আইরমারীরচর। এই ছোট চরে প্রায় ১২০টি পরিবার বাস করে। জীবিকার দায়ে কেউ মাছ ধরেন, কেউ তাঁতের কাজে পাবনা-সিরাজগঞ্জ যান, আবার কেউ ঢাকায় শ্রমিক হয়ে কাজ করেন।

চরের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম (৪৭) তাঁদের একজন। একসময় তিনি শত বিঘা ফসলি জমির মালিক ছিলেন। আইরমারীরচর, রলাকাটা ও পূর্ব দইখাওয়ার চরে তাঁর বাবার সেই জমি এখন নদীগর্ভে মিলিয়ে গেছে। সম্প্রতি কালবৈশাখী ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামত করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বৈশাখ মাস আসলেই ভয় ঘিরি ধরে, এই বুঝি জোড়ে ঝড়-তুফান আসে। ঝড়ে ঘর হারাবে, ফসল নষ্ট হইবে—এই দুশ্চিন্তা মাথায় ভর করে।’

ওই চরের ষাটোর্ধ্ব সরবেশ আলী বলেন, ‘চরের মানুষের আবার বৈশাখ! কালবৈশাখী ঝড় ছাড়া আমাদের আর কোনো বৈশাখ নেই।’ তিনি জানান, একসময় ব্রহ্মপুত্র নদ অনেক দূরে ছিল। গ্রামে ছিল সচ্ছলতা, বৈশাখে বসত মেলা, হতো হাডুডু ও লাঠিখেলা। এখন নদীভাঙনে সব বদলে গেছে। কাজের খোঁজায় তরুণেরা শহরমুখী, গ্রামে রয়ে গেছে মূলত নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা।

চরের এই বাস্তবতা শহরের বৈশাখ উদযাপনের থেকে একেবারে আলাদা। শহরে পান্তা-ইলিশ, নতুন পোশাক আর শোভাযাত্রায় উৎসব চলে, তখন চরাঞ্চলে মানুষ আকাশের দিকে চেয়ে থাকে—ঝড় আসবে কি না, সেই আশঙ্কায়। শহিদুল ইসলামের স্ত্রী মহুরা বেগম বলেন, ‘শহরত মানুষ নয়া জামাকাপড় পরে আনন্দ উৎসব করে, আর আমাগো চরের মানুষ ভাবে, আইজ আবার তুফান আইব না তো?’

কুড়িগ্রামের ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে জেগে ওঠা সাড়ে চার শতাধিক চরে বছরের এই সময় সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা। নতুন ফসল, কাঁচা ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু—সবকিছু ঝুঁকির মুখে। চরের মানুষের আরেক বড় সমস্যা আগাম সতর্কতার অভাব। মাঝের আলগার চরের খামারি মাইদুল ইসলাম বলেন, ‘দেশ ডিজিটাল হয়েছে, কিন্তু আমরা ঝড়ের আগাম খবর পাই না। আগে জানলে গরু-ছাগল সরাতে পারতাম, ঘরও কিছুটা বাঁচানো যেত।’

স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মনির হোসেন বলেন, শিশুরা বইয়ে পড়ে বৈশাখ মানে উৎসব। কিন্তু এখানে বাস্তবে তারা দেখে ঘর বাঁচানোর সংগ্রাম।

কুড়িগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর কালবৈশাখী ঝড়ে জেলার বিভিন্ন চরে শতাধিক বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সঠিক পরিসংখ্যান সংরক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। চলতি বছর এক দিনের ঝড়ে নাগেশ্বরী উপজেলায় অন্তত ১০টি বসতবাড়ি ভেঙে গেছে।

প্রতিকূলতার মধ্যেও চরের জীবন থেমে নেই। ঝড়ের পরদিনই কেউ ভাঙা ঘরের খুঁটি দাঁড় করান, কেউ নতুন করে বীজ বোনেন। সব হারিয়ে আবার নতুন করে শুরু হয় সংগ্রামের জীবন।