কানাইয়ারবাজারের শেডে দুই সারিতে সাজানো সামুদ্রিক ও মিঠাপানির নানা প্রজাতির মাছ। সারির মাঝখানে বসা এক বিক্রেতাকে ঘিরে ক্রেতাদের ভিড়। তাঁর সামনে ১০–১৫ কেজি চাপিলা মাছ রাখা। এক ক্রেতা ৩৫০ টাকা কেজি দরে দুই কেজি চাপিলা কিনলেন। এর পরপরই আরেকজন তিন কেজি নিয়ে নিলেন। ঝুড়িতে থাকা বাকি ছয়–সাত কেজি চাপিলার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। মুহূর্তেই এক ঝুড়ি মাছ শেষ হয়ে যায়।

গত শনিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে কক্সবাজার শহরের বিমানবন্দর সড়কের কানাইয়ারবাজারে এ দৃশ্য সাক্ষাৎ হয়েছে। চাপিলা কেনার কারণ জানতে চাইলে শহরের বদরমোকাম এলাকার ব্যবসায়ী ছৈয়দুল আলম (৪৫) বলেন, "পয়লা বৈশাখে প্রতিবছরের মতো এবারও বাসায় পান্তার আয়োজন থাকবে। কিন্তু কোথাও ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ইলিশের মতো দেখতে চাপিলা দিয়েই আয়োজন সারতে হবে।"

আরেক ক্রেতা ঘোনাপাড়ার বাসিন্দা আজিজুল হক বলেন, সাত দিন আগেও চাপিলা প্রতি কেজি ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বৈশাখকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়িয়েছেন। দেখতে ইলিশের মতো হওয়ায় চাপিলা কিনতে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। অনেকেই বৈশাখের জন্য ফাইস্যা মাছও কিনছেন। ২০০–২১০ গ্রাম ওজনের এসব মাছের দাম কেজিপ্রতি ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা।

বাজারের এক কোণে কিছু ইলিশ বিক্রি করছিলেন ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম। প্রতিটি মাছের ওজন ২৮০–৩৫০ গ্রাম, দেখতে জাটকার মতো। কেজিপ্রতি দাম হাঁকা হচ্ছে ২ হাজার ২০০ টাকা। নজরুল বলেন, শহরের কোথাও ইলিশ নেই। সাত দিন আগে সংগ্রহ করে ফ্রিজে রাখা মাছ বৈশাখ উপলক্ষে বিক্রি করছেন, তাই দাম বেশি।

শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়াছড়া ফিশারিঘাট—পাইকারি মাছের বড় বাজার। সকালে সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের সঙ্গে মাত্র ৫০–৬০টি ইলিশ রয়েছে, ওজন ৩০০–৪০০ গ্রাম। কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা।

ঘাটের পূর্ব পাশে নদীতে নোঙর করে আছে কয়েক শ ট্রলার। এফবি সুলতানা ট্রলারের জেলে আমির হামজা (৫০) বলেন, জ্বালানিসংকটে তাঁর ট্রলার ১৫ দিন ধরে ঘাটে পড়ে আছে। ১৫ এপ্রিল থেকে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ আহরণে ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুরু হবে। নিষেধাজ্ঞার আগে আর সাগরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম, ফলে বাজারে মাছের সংকট আরও বাড়তে পারে।

আরেক জেলে আবুল কালাম বলেন, পাঁচ দিন সাগরে মাছ ধরে শনিবার তাঁদের ট্রলার ঘাটে ফিরেছে। এ সময়ে তাঁরা ১২ মণ চাপিলা, পোপা, মাইট্যা, গুইজ্যা এবং মাত্র ২৯টি ইলিশ পেয়েছেন। গত বছর একই সময়ে পাঁচ হাজারের বেশি ইলিশ ধরেছিলেন তাঁরা। গত পাঁচ–ছয় মাস ধরেই ইলিশের দেখা কম।

ফিশারিঘাটের ইলিশ ব্যবসায়ী ও কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, যে ইলিশ ধরা পড়ছে, তা আকারে ছোট। দিনে এক মণও জোগান দেওয়া যাচ্ছে না।

জেলা মৎস্য বিভাগ জানায়, চলতি অর্থবছরের (২০২৫–২৬) জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে জেলায় ইলিশ আহরণ হয়েছে ৩ হাজার ৫২৩ মেট্রিক টন।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাগরের পরিবেশ বদলে গেছে। বৃষ্টির ধরন পরিবর্তন ও ঘন ঘন নিম্নচাপের কারণে ইলিশ আহরণ কমছে।

কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, জেলায় প্রায় ৫ হাজার ২৫০টি মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে। জ্বালানিসংকটে ৯৫ শতাংশ ট্রলার তিন সপ্তাহ ধরে ঘাটে পড়ে আছে। যে অল্প কিছু ট্রলার সাগরে যাচ্ছে, সেগুলোর জালেও খুব কম ইলিশ ধরা পড়ছে।