বাংলা সন ১৪৩৩–এর জন্য রাজধানীর অন্যতম বড় গবাদিপশুর বাজার গাবতলী হাটের ইজারা প্রত্যাশার তুলনায় কম দামে পড়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)র হাতে। সরকার নির্ধারিত দর ছিল ১৫ কোটি ৫০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। কিন্তু বৈধভাবে দরপত্র জমা দেন একমাত্র দরদাতা, যা সরকারি দরের চেয়ে মাত্র ১২ হাজার টাকা বেশি—অর্থাৎ ১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

ডিএনসিসি সূত্র জানায়, আগ্রহের ঘাটতি এবং কোনো প্রতিযোগিতা না থাকায় এবার হাটের ইজারা মূল্য কম হয়েছে। একমাত্র বৈধ দরদাতা হিসেবে হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. হানিফকে ইজারা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁকে জামানতের টাকা জমা দিতে ইতিমধ্যে চিঠিও পাঠানো হয়েছে।

গত বছরের তুলনায় এবারের দর অনেক কম। ১৪৩২ বাংলা সনে গাবতলী হাট থেকে মোট আয় হয়েছিল ১৭ কোটি ১৫ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে ইজারা চূড়ান্ত হয় ১৫ কোটি ৭১ লাখ টাকায়। এছাড়া ইজারা দেওয়ার আগে প্রায় দেড় মাস খাস আদায় করে করপোরেশন অতিরিক্ত ১ কোটি ৪৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকা আয় করেছিল।

বিধিমালা অনুযায়ী গত তিন বছরের গড় মূল্যকেই সরকারি দর হিসেবে নির্ধারণ করতে হয়। তবে আগে এই গড় মূল্যের সঙ্গে ৫ থেকে ১০ শতাংশ বাড়ানো হতো। ২০২৫ সালের হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) বিধিমালায় সেই সুযোগ রাখা হয়নি।
শওকত হোসেন, প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা, ডিএনসিসি

দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে। হাটের দরপত্রের শিডিউল কিনেছিলেন সাতজন। কিন্তু জমা দেন চারজন। তাঁদের মধ্যে নিয়মমতো বৈধ দর দেন মাত্র একজন। বাকি তিনজনের মধ্যে দুজন দর উল্লেখ করলেও ব্যাংকের পে-অর্ডার জমা দেননি, আর একজন কোনোটাই দেননি।

ডিএনসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিযোগিতার অভাবে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অতীতে একাধিক দরদাতা থাকায় দর বেড়েছে। গাবতলী হাট করপোরেশনের আয়ের প্রধান উৎস হওয়ায় এ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।

প্রসঙ্গত, গাবতলী গবাদিপশুর হাট পয়লা বৈশাখ থেকে এক বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। নতুন ইজারা কার্যকর হবে ১৪ এপ্রিল থেকে। সারা বছর চলে গবাদিপশুর বেচাকেনা, তবে কোরবানির ঈদে এখানে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে ওঠে।

দেড় কোটি টাকা কমে ইজারা

ঢাকা উত্তর সিটির সম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আগের তিন বছরের গড় ইজারা মূল্য হিসেবে এবার সরকারি দর নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৩ সালে ইজারা ছিল ১২ কোটি ২৫ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে বেড়ে হয় ১৭ কোটি ১২ লাখ ১৫ হাজার টাকা। গত বছর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরে ১৫ কোটি ৭১ লাখ টাকায় ইজারা দেয়া হয়। সঙ্গে দেড় মাস খাস আদায়ে ১ কোটি ৪৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকা আয়। তিন বছরে মোট ৪৬ কোটি ৫২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা আয়, গড়ে ১৫ কোটি ৫০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা—যা সরকারি দর।

দরদাতাকে জামানতের টাকা জমা দেওয়ার নোটিশও দেওয়া হয়েছে। টাকা জমা দিলে পয়লা বৈশাখের দিনে অর্থাৎ আগামীকাল ১৪ এপ্রিল হাটের দখল নতুন ইজারাদারকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

সরকারি দর গত বছরের চেয়ে কম হওয়া নিয়ে ঢাকা উত্তরের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা শওকত হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বিধিমালা অনুযায়ী গত তিন বছরের গড় মূল্যকেই সরকারি দর হিসেবে নির্ধারণ করতে হয়। তবে আগে এই গড় মূল্যের সঙ্গে ৫ থেকে ১০ শতাংশ বাড়ানো হতো। ২০২৫ সালের হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) বিধিমালায় সেই সুযোগ রাখা হয়নি।

সম্পত্তি বিভাগের সূত্রে, দ্বিতীয় দফায় দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। বৈধ সর্বোচ্চ ১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা দর দেন মো. হানিফকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। তাঁকে জামানত জমা দেওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। টাকা জমা পড়লে ১৪ এপ্রিল হাটের দখল দেওয়া হবে।

যোগসাজশের অভিযোগ

২০২৬ সালের ইজারা দরপত্র নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, চার প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিলেও কোনো প্রতিযোগিতা হয়নি। বৈধ দর দেন একাই মো. হানিফ—১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা, সরকারি দরের চেয়ে মাত্র ১১ হাজার ৯৯০ টাকা বেশি।

আগ্রহীদের যোগসাজশ নিয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর ও স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে মুক্তকণ্ঠ কথা বলে। জানা যায়, দরপত্রকারীদের মধ্যে পারিবারিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। কারও সঙ্গে আত্মীয়তা, কেউ একই দলে যুক্ত।

তাঁদের মধ্যে রাইদ ট্রেডিংয়ের মালিক আশিক ইকরাম, সাবেক ইজারাদার লুৎফর রহমানের ছেলে। মো. হানিফ তার ফুফাতো ভাই। এস এফ করপোরেশনের মালিক শেখ ফরিদ ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক। ক্ল্যাসিক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল কাফরুল থানা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।

আগ্রহী দরদাতাদের যোগসাজশের বিষয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর ও স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা হয় মুক্তকণ্ঠের। জানা যায়, দরপত্রে অংশ নেওয়াদের মধ্যে পারিবারিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। কারও সঙ্গে পারিবারিক আত্মীয়তা রয়েছে আবার কেউ কেউ একই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত।

‘আব্বুর নেগোসিয়েশন হইছে’

দরপত্র জমা দিলেও পে-অর্ডার না দেওয়া নিয়ে রাইদ ট্রেডিংয়ের আশিক ইকরাম বলেন, ‘হানিফ ভাইয়ের সঙ্গে মনে হয় আব্বুর নেগোসিয়েশন হইছে। পরে আমারে ড্রপ করতে মানা করছে। আমি ড্রপ করি নাই।’ হানিফ তার ফুফাতো ভাই বলেও জানান।

পে-অর্ডার না দিয়ে সর্বোচ্চ ২৬ কোটি টাকা দর দেন ক্ল্যাসিক ট্রেডের হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ড্রপিং করার জন্য সর্বোচ্চ প্রিপারেশন নিয়ে সবকিছু সেটআপ করা ছিল। রেট তখন লিখে ফেলছিলাম। পে-অর্ডারও কিছু হাতে ছিল। কিন্তু একটা পে-অর্ডার ডিলে হওয়ার কারণে টোটালি ঝামেলায় পড়ে গেছি।’

এসএফ করপোরেশনের শেখ ফরিদ দরপত্র জমা দিলেও দর বা পে-অর্ডার দেননি। একমাত্র মো. হানিফ বৈধভাবে সব জমা দেন। যোগসাজশ অস্বীকার করে তিনি বলেন, দরপত্রের শিডিউলের দাম তিন লাখ টাকা। অনেকে মিলেমিশে ধান্দা করতে শিডিউল কেনে।

তাঁর কাছে এমন প্রস্তাব এসেছিল জানিয়ে মো. হানিফ বলেন, ‘আমি কইছি যে ভাই যার যারটা দাও। দুই একজন টেলিফোন করছিল যে ভাই আমরা কিনছি বসি, পার্টনার ব্যবসা করি। না আমি টেন্ডার দিছি আর তোমরা যদি টেন্ডার দাও দিতে পার। আমি মিলামিশে ব্যবসা করি না—এইভাবে আমি বইলা দিছি।’

আশিক ইকরামের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমাদের সঙ্গে তাদের ঝামেলা আছে। তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো না।’