পালিয়ে বিয়ে, স্বামীর নির্যাতন, গর্ভে সন্তান নিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা, গানের সুযোগ হারানো—এমন নানা নিরাশার জালে জড়িয়ে পড়লেও শুধু সংগীতের বলে জীবনকে আশার পথে এনে দাঁড় করিয়েছেন তিনি। আট দশকের ক্যারিয়ারে কুড়িটি ভাষায় ১২ হাজারের বেশি গান গেয়েছেন। শাস্ত্রীয় থেকে পপ—সব ধরনের গানেই ছিলেন সমান দক্ষ। মীনা কুমারী, মধুবালা, রেখা, জিনাত আমান, শ্রীদেবী, কাজলের মতো নায়িকাদের ঠোঁটে অসংখ্য গান অমর করে দিয়েছেন।

হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৯২ বছর বয়সে সুরলোকের যাত্রা শেষ করেন আশা ভোসলে। গতকাল মুম্বাইয়ের এক হাসপাতালে এই প্লেব্যাক গায়িকার মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

সুযোগ পেতেন লতা
আশা ভোসলের বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন খ্যাতিমান শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ও থিয়েটার অভিনেতা। ১৯৪২ সালে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পর পরিবার সহায়হীন হয়ে পড়ে। ৯ বছর বয়সী আশা এবং বড় বোন লতা মঙ্গেশকর বেঁচে থাকার জন্য গান গেতে শুরু করেন।

১৯৪৩ সালে ১০ বছর বয়সে প্রথম মারাঠি চলচ্চিত্রের জন্য গান রেকর্ড করেন আশা। পরে হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। ধীরে ধীরে বোম্বের সংগীতজগতে নিজের স্থান করে নেন। এর মধ্যে ১৬ বছর বয়সে পালিয়ে ব্যবস্থাপক গণপতরাও ভোসলেকে বিয়ে করেন। তিনি তাঁর চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বয়স্ক ছিলেন এবং বিয়েতে পরিবারের সম্মতি ছিল না। তিন সন্তানের জন্মের পর ১৯৬০ সালে সম্পর্কটি বিচ্ছেদে শেষ হয়।

একাই সন্তানদের লালন করতে থাকেন আশা। পাশাপাশি বলিউডে কাজের সুযোগ খুঁজতে থাকেন। ততদিনে লতা তারকা হয়ে উঠেছেন। সুরকাররা তাঁরই পিছনে ছুটতেন। শাস্ত্রীয় গানের প্রথম সুযোগ লতাই পেতেন। আশা গাইতেন ক্যাবারে ও যৌনতাপূর্ণ গান—যা অন্য গায়িকারা গাইতে অস্বীকার করতেন। এই গানগুলোতেই নিজের পথ খুঁজে পান আশা।

প্রথম পরিচিতি
আশার প্রতিভা প্রথম চিহ্নিত করেন ও পি নায়ার। লতার বদলে আশাকেই বেছে নেন এই সুরকার। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে বলিউডের আকর্ষণীয় কয়েকটি সংগীত তৈরি করেন তাঁদের জুটি। ‘আও হুজুর তুমকো’, ‘উড়ে জব জব জুলফে তেরি’, ‘দিওয়ানা হুয়া বাদল’—এমন গান উপহার দেন তারা। এই জুটি হিন্দি সিনেমার গানে নতুন মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে লতার ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেন আশা।

১৯৮১ সালে ‘উমরাও জান’ চলচ্চিত্রের গানের জন্য তাঁকে বেছে নিয়ে পরিচালক মুজাফফর আলী আশাকে নতুন চ্যালেঞ্জ দেন। শাস্ত্রীয় সংগীত গেয়ে নারীর অব্যক্ত যন্ত্রণা সুরে ফুটিয়ে তুলতে হয়। চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন আশা। খৈয়ামের সুরে ‘দিল চিজ কিয়া হ্যায়’, ‘ইন আঁখোঁ কি মস্তি’, ‘জুস্তজু জিসকি থি’ গানে উমরাওয়ের যন্ত্রণাকে দরদভরা কণ্ঠে তুলে ধরেন।

আর ডি বর্মনের সঙ্গে জুটি
নায়ার পরিচয় দিলেও খ্যাতির শিখরে নিয়ে যান আর ডি বর্মন (পঞ্চম)। ১৯৬০-এর মাঝামাঝি থেকে একসঙ্গে কাজ শুরু করেন, পরবর্তী দুই দশকে ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের সেরা জুটি হয়ে ওঠেন। পাশ্চাত্য জ্যাজ-ফাঙ্কি প্রভাব থাকলেও বর্মনের সুর ভারতীয় ছিল গভীরভাবে। আশার কণ্ঠে ছিল তীক্ষ্ণতা। ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘দম মারো দম’, ‘ইয়ে মেরা দিল’ গানগুলো হিন্দি চলচ্চিত্রের গানকে নতুন সংজ্ঞা দেয়। গান থেকে প্রেমে পরিণত হয় সম্পর্ক এবং ১৯৮০ সালে বিয়ে হয়।

কাঁটাভরা পথ
মাইক্রোফোনের সামনে আশা ভোসলের জীবন আলোকিত ছিল। কিন্তু আড়ালে ছিল গাঢ় অন্ধকার; জীবনভর দুঃসহ যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করেছেন। ২০১২ সালে কনসার্ট চলাকালীন মেয়ে বর্ষা আত্মহত্যা করেন। ২০১৫ সালে বিদেশে পারফর্ম করছেন ছেলে হেমন্ত, তখন ক্যানসারে মারা যান।

‘আশা ভোসলে: আ লাইফ ইন মিউজিক’ বইয়ে গণপতরাও ভোসলের সঙ্গে যন্ত্রণাদায়ক দাম্পত্য থেকে আত্মহত্যার চেষ্টা—সবই বর্ণনা করেছেন আশা। বইয়ে আছে, ‘শোনা যায়, গণপতরাও ছিলেন মদ্যপ, প্রায়ই স্ত্রীকে মারধর করতেন—এমনকি গর্ভাবস্থায়ও, যার ফলে তাঁকে প্রায়ই হাসপাতালে ভর্তি হতে হতো।’ প্রথম দাম্পত্য নিয়ে আশা বলেন, পরিবারটি ছিল রক্ষণশীল, গায়িকা পুত্রবধূকে মেনে নিতে পারেনি তারা। স্বামী সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমার স্বামীর মেজাজ খারাপ ছিল। হয়তো তিনি কষ্ট দিতে পছন্দ করতেন, হয়তো স্যাডিস্ট ছিলেন। কিন্তু বাইরে কেউ তা জানতে পারত না। আমি তাঁকে সম্মান দিতাম, কখনো তাঁর কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলিনি।’

জীবনীতে আশা জানান, তৃতীয় সন্তান গর্ভে থাকাকালে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। আশা বলেন, ‘একবার মনে হয়েছিল, আমার নিজের জীবন শেষ করে দেওয়া উচিত। আমি অসুস্থ ছিলাম। চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় হাসপাতালে ছিলাম, যেখানে পরিস্থিতি খুবই খারাপ ছিল।’ মানসিক অবস্থা বর্ণনায় বলেন, ‘মনে হয়েছিল যেন নরকে এসে পড়েছি। মানসিক যন্ত্রণায় ছিলাম। তাই ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু গর্ভের সন্তানের প্রতি ভালোবাসা এতটাই প্রবল ছিল যে আমি মারা যাইনি।’

পুরস্কার
২০০০ সালের দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার এবং ২০০৮ সালের পদ্মবিভূষণ পান আশা।

বিবিসি, ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে