গান ছিল তাঁর জীবনের সারাংশ, আর জীবন ছিল গানেরই প্রতিধ্বনি। ‘আমি গাইতে গাইতেই মরতে চাই’—এই কথাটি বলেছিলেন আশা ভোসলে। আজ রবিবার দুপুরে তাঁর মৃত্যুর সংবাদে ভারতের সংগীতজগৎ থমকে দাঁড়িয়েছে। গতকাল শনিবার রাতে অসুস্থতার খবর বেরিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই কিংবদন্তিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। বয়স ছিল ৯২। দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য চলচ্চিত্র ও অ্যালবামে গান গেয়েছেন তিনি। পেয়েছেন দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, পদ্মভূষণসহ বহু সম্মাননা। ১৯৯৭ সালে গ্র্যামি মনোনয়নও করা হয় তাঁকে।
কিছুদিন আগে ‘কাপল অব থিংস’ পডকাস্টে স্বামী আর ডি বর্মনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, এত বড় সংগীত পরিচালক হয়েও আর ডি বর্মনের কোনো অহংকার ছিল না। তাঁর কাছে গানই ছিল সবচেয়ে মূল্যবান—‘তাঁকে যদি হিরে দিতাম, বলতেন—এটা কী! বরং একটা ভালো গান রেকর্ড করো।’
২০২৩ সালে ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দুবাইয়ে ‘আশা@নাইনটি’ কনসার্টের আগে এক আলাপচারিতায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি এই ইন্ডাস্ট্রির শেষ মোগল। আমার সামনে সবাই এক এক করে চলে গেছেন, আমি একা রয়ে গেছি।’ এতে বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের স্মৃতি ফিরে আসে; ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে গান গাওয়া দিনগুলোর কথা তিনি গভীর আবেগে স্মরণ করেছিলেন। মঞ্চে ওঠার আগে তাঁর ভেতরে ভয় জাগত। তিনি বলেছিলেন, স্টুডিওতে সবকিছু সহজ লাগে, কিন্তু মঞ্চে আবেগ পুরোটা দখল করে নেয়—গলা কাঁপে, স্মৃতি ভেসে ওঠে, শ্রোতাদের সঙ্গেও তৈরি হয় এক অদ্ভুত সংযোগ।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত উচ্চারণ—‘আমার একমাত্র ইচ্ছা, আমি যেন গান গাইতে গাইতেই মারা যাই।’ শৈশব থেকে শাস্ত্রীয় সংগীত শেখা, আট দশকের বেশি প্লেব্যাক—সব মিলিয়ে তাঁর কাছে জীবন ছিল গানের যাত্রা। ‘রকি অউর রানি কি প্রেমকাহানি’ ছবিতে তাঁর গাওয়া ‘ঝুমকা গিরা রে’-এর রিমিক্স নিয়ে বলেছিলেন, এখন গান বদলে গেছে—পুরোনো সুরে নতুন সংযোজন হচ্ছে, যা সব সময় ভালো লাগে না; তবু সময়ের এই পরিবর্তন মেনে নিতে হয়। আশা ভোসলে নেই, শুনেই কেঁদে ফেললেন রুনা লায়লা।
শেষ জীবনেও তাঁর সাধনায় কোনো ছেদ পড়েনি। নতুন সংগীতচর্চা, এমনকি অভিনয়ে হাতেখড়ি—সবকিছুতে সমান উৎসাহ ছিল। নিয়মিত অনুশীলন করতেন ভোরে, সকালে, এমনকি মধ্যরাতেও তানপুরা হাতে বসে, শুধু যাতে কারও ঘুম না ভাঙে। চড়াই-উতরাইয়ের জীবনকে ব্যাখ্যা করতে বলেছিলেন, ‘জিন্দেগি ক্যায়সি হ্যায় প্যাহেলি হায়…কখনো হাসায়, কখনো কাঁদায়।’ ১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাংলিতে জন্ম। বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন বিশিষ্ট শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী। অল্প বয়সেই বাবাকে হারান, মাত্র ৯ বছর বয়সে দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে গান ও অভিনয়ের জগতে পা রাখেন।
মারাঠি ছবির গান দিয়ে শুরু, তারপর হিন্দি ছবিতে প্রতিষ্ঠা। ‘মাঝা বল’ ও ‘চুনরিয়া’ ছবিতে প্রাথমিক কাজ ভবিষ্যতের বিশাল যাত্রার ভিত গড়ে। ২০১১ সালে বিশ্ব রেকর্ডে নাম ওঠে—সংগীতের ইতিহাসে সর্বাধিক গান রেকর্ড করার কৃতিত্ব। ২০টির বেশি ভাষায় ১১ হাজারের বেশি গান। গজল, শাস্ত্রীয়, আধুনিক কিংবা ক্যাবারে—সব ঘরানায় সমান সাবলীল। কত সম্পদ রেখে গেলেন আশা, কে উত্তরাধিকারী।
হিন্দি ছবির জগতে ওপি নায়ার থেকে আর ডি বর্মন—বহু সুরকারের সঙ্গে কাজ কিংবদন্তি। আর ডি বর্মনের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে, পরে বিবাহবন্ধন। ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘দম মারো দম’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’—এমন অসংখ্য গান অমলিন। ‘উমরাও জান’ ও ‘ইজাজত’ ছবির গানে জাতীয় পুরস্কার পান। পাশাপাশি দাদাসাহেব ফালকে সম্মান, পদ্মশ্রী ও পদ্মবিভূষণ। আগামীকাল সোমবার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মুম্বাইয়ে শেষকৃত্য হবে। তবু গানে, স্মৃতিতে, শ্রোতাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন আশা ভোসলে।






