সঙ্গীতজগতে অসামান্য সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে ছিল আশা ভোসলের এক নীরব সংগ্রাম। তাঁর জীবনের শুরুর দিকে যে কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তা অনেক বছর পর তাঁর নিজের মুখে প্রকাশ পায়।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে পালিয়ে বিয়ে করেন আশা ভোসলে। তাঁর স্বামী গণপতরাও ভোসলে ছিলেন তাঁর চেয়ে প্রায় ২০ বছরের বড়। এই বিয়েটি শুধু পরিবার থেকে দূরত্ব সৃষ্টি করেনি, তাঁর জীবনে এক দীর্ঘ অশান্তির সময়ও নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে বড় বোন লতা মঙ্গেশকর এই বিয়েকে মেনে নিতে পারেননি; দীর্ঘদিন দুই বোনের মধ্যে কথাবার্তা পর্যন্ত বন্ধ ছিল।
বিয়ের পর আরেক লড়াই শুরু হয়। সংসারের আর্থিক অবস্থা ছিল খুবই দুর্বল—স্বামীর মাসিক আয় মাত্র ১০০ টাকা, যা দিয়ে বড় পরিবার চালানো প্রায় অসম্ভব ছিল। ফলে অল্প বয়সেই আশাকে সংসারের সব দায়িত্ব নিতে হয়। গানের কাজের পাশাপাশি শ্বশুরবাড়ির সব কাজ, সন্তানদের দেখাশোনা—সবকিছু তাঁকে সামলাতে হয়।
এই সময়েই প্রথম সন্তানের জন্ম দেন আশা ভোসলে। কিন্তু মাতৃত্বের আনন্দ ভোগ করার সুযোগ ছিল না। এক মাসের শিশুকে বাড়িতে রেখে গান গাইতে বেরিয়ে পড়তে হতো। কারণ সংসার চালানোর আর কোনো উপায় ছিল না। ভোর পাঁচটায় উঠে রেওয়াজ, তারপর ঘরের কাজ, এরপর গান—এভাবে কাটত প্রতিদিন। কখনো কাজ পাওয়া যেত, কখনো না—অনিশ্চয়তাই ছিল সঙ্গী।
ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে কালো অধ্যায় ছিল দাম্পত্য সম্পর্ক। একাধিক সাক্ষাৎকারে আশা নিজেই বলেছেন—এই বিয়ে নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারে ভরা ছিল। শ্বশুরবাড়ির রক্ষণশীল মানসিকতা একজন গায়িকাকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। ‘ওরা একজন গায়িকাকে পুত্রবধূ হিসেবে নিতে পারেনি’—এমনটাই বলেছিলেন তিনি।
পরিস্থিতি চরমে পৌঁছে যখন তৃতীয় সন্তানের গর্ভে থাকাকালীন স্বামীর বাড়ি ছাড়তে বলা হয় আশাকে। তখন তিনি মায়ের ও ভাইবোনদের কাছে ফিরে আসেন। এরপর থেকে শুরু হয় একক মায়ের লড়াই।
তিন সন্তানকে প্রায় একাই বড় করেন আশা। সেই কঠিন সময়ে কেউ পাশে ছিল না, তবু তিনি থেমে যাননি। বরং সেই সংগ্রাম তাঁকে আরও শক্তিশালী করে। সংগীতজগতে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা করে নেন তিনি—যদিও ‘সাহসী’ বা ‘বোল্ড’ গান গাওয়ার জন্য সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।
এই সমালোচনার জবাব দেন আশা সোজাসাপ্টা ভাষায়—‘আমি কি আনন্দের জন্য গান গাইতাম? সংসার চালাতে, সন্তানদের বড় করতে আমাকে কাজ করতেই হতো।’
১৯৬০ সালে প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়। পরে ১৯৮০ সালে সুরকার আর ডি বর্মনকে বিয়ে করেন, যা তাঁর জীবনে নতুন অধ্যায় নিয়ে আসে। যদিও এই সম্পর্ক বেশি দিন স্থায়ী হয়নি, ১৯৯৪ সালে বর্মন মারা যান।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে






