প্রখ্যাত ভারতীয় সংগীতশিল্পী আশা ভোসলে ৯২ বছর বয়সে মারা গেলেন, যেমনটি তাঁর বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের ক্ষেত্রেও হয়েছিল। গত বছর একাধিকবার তাঁর মৃত্যুর গুজব ছড়ায়। তখন এক সাক্ষাৎকারে আশা ভোসলে বলেছিলেন, “নিশ্বাস বন্ধ হলে মানুষ মারা যায়। গানই হলো আমার সেই নিশ্বাস।” গণমাধ্যমের খবর অনুসারে, ৯১ বছর বয়সেও প্রয়াত স্বামীকে উৎসর্গ করে তিনি ‘সাইয়াঁ বিনা’ গানটি রেকর্ড করেন। ২০২৪ সালে দুবাইয়ে স্টেজ পারফর্ম করেছেন শেষবার। ১৯৪৩ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে মারাঠি সিনেমায় প্লেব্যাক শুরু করেন, আর সর্বশেষ গেয়েছেন ২০২২ সালের হিন্দি ছবি ‘লাইফ’স গুড’-এ। আট দশকের ক্যারিয়ারে হাজার হাজার গান তাঁকে খ্যাতি এনে দিয়েছে, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনও বারবার আলোচনায় এসেছে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে ম্যানেজারকে বিয়ে করেন। কিন্তু সেই সংসার সুখের ছিল না। বিচ্ছেদের ২০ বছর পর দ্বিতীয় বিয়ে করেন আশা—নতুন সংসার কি সুখী ছিল? বিস্তারিত বলছেন হাসান ইমাম।
ভারতের মঙ্গেশকর পরিবার দুই বোনের জন্য বিখ্যাত হয়েছে, আর আজ চলে গেলেন তাঁদের দ্বিতীয়জন। আশা ভোসলের নাম দীর্ঘ ৯ দশকে এক ব্র্যান্ড হয়ে উঠেছে। ২০টি ভাষায় হাজার হাজার গান শ্রোতাদের মুখে মুখে ঘুরেছে দশকের পর দশক।
কাছাকাছি সময়ে ক্যারিয়ার শুরু করা লতা ও আশা দেশের সীমা পেরিয়ে বিদেশেও জনপ্রিয় হয়েছেন। তাই তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও মানুষের কৌতূহল ছিল।
আশা যখন কিশোরী হয়ে একের পর এক গান রেকর্ড করছেন, তখন ম্যানেজার গণপতরাও ভোসলের সঙ্গে প্রেমে জড়ান। কিন্তু দুই পরিবারই এই সম্পর্ক মানেনি। ফলে ১৬ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে প্রেমিককে বিয়ে করেন আশা।
তারপর থেকে আশা মঙ্গেশকর হয়ে যান আশা ভোসলে। নিজের চেয়ে প্রায় ২০ বছরের বড়ের সঙ্গে বিয়ে করে বাড়ি ছাড়ার পর দুই বোনের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যায়।
সেই সময় লতা মঙ্গেশকর প্রথম সারির শিল্পী হয়েও উঠেছেন, আশা তখনো উঠতি। তিনি হিন্দি, মারাঠি সহ নানা ভাষার বি ও সি গ্রেড সিনেমায় গান গাইতেন।
উঠতি ক্যারিয়ার, অল্প বয়সে বিয়ে, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা—শ্বশুরবাড়িতেও সমাদর পাননি আশা।
এক সাক্ষাৎকারে আশা বলেছিলেন, “ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম, তাই দিদি (লতা) আমার সঙ্গে দীর্ঘদিন কথা বলেননি। তিনি এই বিয়ে মেনে নিতে পারেননি।”
স্বামীর কাছ থেকে অবহেলা ও অত্যাচার সহ্য করেন আশা। এই অশান্তির মধ্যে বাইরে ভালো সিনেমায় গান পেতে শুরু করেন।
বর্ষা ও হেমন্ত নামে দুই সন্তানের মা হয়ে আবার অন্তঃসত্ত্বা হন আশা। তখন বোনের সঙ্গে টুকটাক কথা হয়। কিন্তু স্বামী গণপতরাও ভোসলে তা চাননি। গণপত নাকি একাধিকবার আশার গায়ে হাত তোলেন।
এমনই এক সময়ে তৃতীয় অন্তঠসত্ত্বায় তুমুল ঝগড়ার পর স্বামী বাড়ি ছাড়তে বলেন। সেদিনই মায়ের বাড়িতে ফিরে আসেন আশা। সেখানে জন্ম নেন তৃতীয় সন্তান আনন্দ ভোসলে।
১৯৬০ সালে গণপতরাওয়ের সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় আশার। ছয় বছর পর মারা যান গণপতরাও।
‘আশা ভোসলে: আ লাইফ ইন মিউজিক’ বইয়ে আশা জানিয়েছিলেন, তৃতীয় সন্তান গর্ভে থাকাকালে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। আশা বলেন, “চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় হাসপাতালে ছিলাম, যেখানে পরিস্থিতি খুবই খারাপ ছিল।”
তিন সন্তানের মধ্যে বর্ষা ভোসলে ২০১২ সালে আত্মহত্যা করেন, মেজো হেমন্ত ২০১৫ সালে ক্যান্সারে মারা যান। ছোট ছেলে আনন্দ ভোসলের সঙ্গেই ছিলেন আশা। মায়ের নামে আন্তর্জাতিক চেইন রেস্তোরাঁর ব্যবসা চালান আনন্দ।
সব সংগ্রাম সত্ত্বেও কারও প্রতি ক্ষোভ নেই জানিয়ে আশা বলেছিলেন, “সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছি। ওই বিয়ে না হলে তো আমার তিন সন্তানকে পেতাম না।”
১৯৫৬ সালে শচীন দেববর্মনের স্টুডিওতে রেকর্ডিংয়ে এসে প্রথম দেখা হয় রাহুল দেববর্মনের সঙ্গে। কিন্তু সম্পর্ক গড়তে লাগে প্রায় ১০ বছর। গণপতরাওয়ের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর গানে মন দেন আশা।
ষাটের দশক থেকে হিট গান গাইতে শুরু করেন। আরডি বর্মনের সঙ্গীতে গাইতে গিয়ে কাছাকাছি আসেন। বাস্তবে জুটি হওয়ার আগেই তাঁদের গান হিট হয়।
‘তিসরি মঞ্জিল’ ছবির গান ইতিহাস তৈরি করে। আরডি তখন রিতা প্যাটেলের সঙ্গে বিচ্ছেদের যন্ত্রণায়। এই একাকিত্ব তাঁদের কাছে টানে। ষাটের শেষে মন দেওয়া-নেওয়া শুরু হয়।
প্রথম বিচ্ছেদের ২০ বছর পর ১৯৮০ সালে আরডি বর্মনকে (রাহুল দেববর্মন) বিয়ে করেন আশা। শুরুতে রাহুলের মা মীরা দেববর্মন মানেননি—আশা তো তিন সন্তানের মা এবং ছয় বছরের বড়। কিন্তু ছেলের প্রেম টলায়নি।
আশা-আরডি নিঃসন্তান ছিলেন। বিয়ের প্রায় ১০ বছর পর জীবনযাত্রার পার্থক্যে আলাদা থাকতে শুরু করেন। তবু একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখেন শেষ দিন পর্যন্ত।
তাই জীবনের শেষ রেকর্ড করা গান ‘সাইয়াঁ বিনা’ প্রয়াত স্বামী আরডি বর্মনকে উৎসর্গ করতে পেরেছেন আশা ভোসলে।
তথ্যসূত্র: এনডি টিভি, নিউজ এশিয়া, টিভি নাইন, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও ‘আশা ভোসলে: আ লাইফ ইন মিউজিক’






