প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আশা ভোসলের মৃত্যুতে শোকের মধ্যে ভেসে উঠেছে লেখকের শোনা-দেখা সেই স্মরণীয় একটি দিনের কথা। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে রুনা লায়লার সঙ্গে যোগাযোগের পর যে রেকর্ডিং অভিজ্ঞতা হয়েছিল, সেটি এখনো মনে দাগ কেটে আছে।
লেখক বলেন, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কোনো একদিন তিনি রুনা লায়লার কাছ থেকে ফোন পান। রুনা লায়লা জানান সন্ধ্যায় তাঁর বাড়িতে যেতে পারবেন কি না—উত্তরে লেখক বলেন, পারবে। তবে আমন্ত্রণের কারণ বা বিস্তারিত কিছুই বলা হয়নি। সন্ধ্যায় বাড়িতে গেলে রুনা লায়লা জানান, একটি গান লিখতে হবে। তিনি জানান, সুর ইতিমধ্যে করে রেখেছেন এবং সেই সুরের ওপর লিখতে হবে।
লেখক জানান, এর আগে রুনা লায়লার সুরে তিনি একটি গান লিখেছিলেন, যা রুনা লায়লাতেই গেয়েছিলেন। এবারও তিনি ভেবেছিলেন হয়তো সেই গানটি রুনা লায়লাদের নিজের জন্যই। কিন্তু সুর শোনানোর আগে যার কথা বলা হয়, তাঁর নাম শুনেই লেখক বুঝতে পারেন—আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা, স্বপ্নে ও ঘোরে থাকা, শৈশব থেকে যার গান শুনে বেড়ে ওঠা সেই কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী আশা ভোসলের জন্যই গানটি লেখা হচ্ছে। এরপর তিনি সুরের ওপর গানটি লিখে ফেলেন—‘চলে যাওয়া ঢেউগুলো আর ফিরে আসেনি, ভেঙে যাওয়া মন আর ভালোবাসেনি’।
লেখকের বিবরণ অনুযায়ী, গানটির ভয়েস রেকর্ড হবে মুম্বাইয়ে। তিনি রুনা আপাকে জানান, আশাজি যেদিন ভয়েস দেবেন সেদিন তিনি রেকর্ডিংয়ে থাকতে চান। এরপর দিনক্ষণ ঠিক হয়—৩০ অক্টোবর রাতের ফ্লাইট ধরে কলকাতায় এবং ভোরের ফ্লাইটে ৩১ অক্টোবর মুম্বাই। মুম্বাই থেকে জুহু রোড ধরে এ জে ভাসান স্টুডিওতে গিয়ে সরাসরি রেকর্ডিং-স্থলে উপস্থিত হন। এই গানের সংগীতায়োজন করেছিলেন রাজা কাশেফ।
অল্প সময়ের মধ্যে আলমগীর ও রুনা লায়লা আসেন। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, অপেক্ষা ছিল মহান শিল্পী আশা ভোসলের জন্য। শেষ বিকেলে তিনি আসেন। লেখক দ্রুত গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে সালাম জানান। রুনা লায়লা তখন পরিচয় করিয়ে দেন—‘আপনি যে গানটি গাইবেন, সেটি ওরই লেখা।’ এরপর তিনি যোগ করেন, ‘শুধু আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্যই আজই বাংলাদেশ থেকে ও এসেছে।’ কুশল বিনিময়ের পর আশা ভোসল রুনা লায়লাকে অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, ‘চলো গানটা আরেকবার তুলে দাও তো দেখি। কী খতরনাক সুর করেছ। আমি তো সেই সকালে উঠেই রেওয়াজ করে নিলাম।’
তারপর তিনি সুর তুলতে থাকলে লেখক বাংলায় পুরো গীতিকবিতাটি লিখে আশাজির দিকে বাড়িয়ে দেন তাঁর অটোগ্রাফের জন্য। এরপর ছবি তোলার ইচ্ছা প্রকাশ হয় এবং আশা ভোসলের সঙ্গে ছবি তোলেন লেখক। আশা ভোসল তাঁর মাথায় আশীর্বাদের হাত রাখেন। (ছবিটি লেখকের ফেসবুক আইডির প্রোফাইল পিকচারে ২০১৯ থেকেই দেওয়া)। গান তোলার পর আশা ভোসলে ভয়েস বুথে যান। লেখক উল্লেখ করেন, বয়স তখন ৮৫ বছর। কিন্তু কণ্ঠ ভেসে এলে তাঁর কাছে মনে হয়নি—বয়স হয়েছে।
লেখকের মতে, তাঁর বিনয় ও সংগীতের প্রতি যে ত্যাগ ছিল, সেটি সামনে বসেই উপলব্ধি করতে পেরেছেন তিনি। লেখক জানান, কাউকে এমনি এমনিতেই ‘মহিরুহু’র মতো বড় হয়ে উঠতে দেখা যায় না; সেখানে থাকে অধ্যবসায়, নিষ্ঠা ও ধ্যান।
লেখকের তথ্য অনুযায়ী, যত দূর তিনি জানেন, এটি ছিল আশা ভোসলে গাওয়া শেষ বাংলা গান—‘চলে যাওয়া ঢেউগুলো আর ফিরে আসেনি, ভেঙে যাওয়া মন আর ভালোবাসেনি’। আশা ভোসলে চলে গেছেন। সংগীতের আকাশ থেকে আজ একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র খসে গেল—এমনই শোকপ্রকাশ করেছেন লেখক। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তাঁর আলোয় সংগীতাঙ্গন আজীবন আলোকিত থাকবে।