কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা দলের অভ্যন্তরীণ এক অংশের বিরোধিতার ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, সেই পক্ষ এখনো তাঁর প্রতি সক্রিয়। সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কের মধ্যে তিনি বলেন, ‘যারা জাতীয় নির্বাচনে চায়নি আমি মনোনয়ন পাই, তারা এখনো অপচেষ্টায় লিপ্ত আছে।’ এই বক্তব্য নতুন আলোচনা ছড়িয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা। কিন্তু দল তাঁকে মনোনীত করেনি। সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের জন্য ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে দলীয় এক নেত্রীর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।
এই ঘটনায় সরাসরি প্রতিক্রিয়া না দিলেও গতকাল মধ্যরাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন কনকচাঁপা। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘বছরজুড়ে নিজের দলের ভেতরের বাধাবিপত্তি পেরিয়ে নিরলস কাজ করেছি। কিন্তু কোনো কারণে দল আমাকে মনোনীত করেনি। তা আমি কষ্ট পেলেও মেনে নিয়েছি। সে জন্য কে কী ভাবল তাতে আমার কিছু আসে-যায় না। দলের প্রতি আমার আনুগত্য শতভাগ। কিন্তু অযথা অন্যায়ভাবে মিথ্যাচার করে মানুষের কাছে আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করার হীনপ্রচেষ্টা বস্তুতই দুরভিসন্ধি। আমার মনে হয়, যারা জাতীয় নির্বাচনে চায়নি যে আমি নমিনেশন পাই, তারা এখনো এই অপচেষ্টায় লিপ্ত আছেন।’
কনকচাঁপার এই কথায় স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, দলের ভিতরকার একটি অংশ তাঁর মনোনয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। এর আগে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের সময় বগুড়া জেলা বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় মহিলা দলের নির্বাহী সদস্য সুরাইয়া জেরিন কনকচাঁপাকে নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা বিএনপির কে? সে কি দল করেছে? যারা আন্দোলনে ছিল, ১৭ বছর দলের ঢাল হয়ে আমরা খেটেছি।’
জেরিন আরও বলেন, ‘বগুড়ার রাজপথে, ঢাকার রাজপথে ছিলাম। ১৭ বার জেলে গিয়েছি। মহিলাদের মধ্যে সর্বোচ্চ মামলা খেয়েছি। কনকচাঁপা এতদিন কোথায় ছিল? আমাদেরকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কেন? কনকচাঁপা কে? আমরা সুবিধাবাদীদের দেখতে চাই না। রাজপথে যারা লড়াই সংগ্রাম করেছে আমরা তাদেরকে চাই। কনকচাঁপা কয়টা মামলা খেয়েছে? কয়টা লড়াই সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে?’
নিজের পোস্টে কনকচাঁপা লিখেছেন, ‘বিগত আমলে আমরা নেতাকর্মীরা নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছি, কেউ জেল খেটেছে, কেউ মামলা খেয়েছে। আর আমি? আমি মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব হয়ে গেছি। একজন শিল্পী গাইতে না পারলে তার কী বাকি থাকে বলুন? বাংলাদেশের মাটিতে কোথাও কোনো গান গাইতে পারিনি। আমি নিজেকে সুস্থ রাখার জন্য ফুলও লতা-পাতার ছবি আঁকা, আমার পরিবার ও রান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করেছি। আমি সবার ক্ষতিকেই ক্ষতি হিসেবে দেখি, তাদের এই ত্যাগকে মূল্যায়ন করি, কিন্তু আমার এই যে ক্যারিয়ার হারানো, নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার কোনো স্বীকৃতি কি আমি পেতে পারি না?’
নিজের রাজনৈতিক যাত্রা ২০১৩ সালে শুরু হয় উল্লেখ করে কনকচাঁপা লিখেছেন, ‘আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০১৩ সালে আমাকে রাজনীতিতে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। তখন তিনি মহিলা সংরক্ষিত আসনের বদলে সরাসরি জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কথা বলেন এবং যেটা আমার জন্য খুবই কঠিন কাজ ছিল। তবু আমি তাঁর কথা বেদবাক্য হিসেবে মেনে নিয়ে কাজ শুরু করি। যার ফলে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে একজন বর্ষীয়ান দুঁদে রাজনীতিবিদের মুখোমুখি হয়ে নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন পাই। বলা বাহুল্য, সেই যাত্রা সহজ ছিল না। ছিল বিপৎসংকুল এবং আমার জন্য দুরূহ। আমি এবং আমার আল্লাহ জানেন, আমার সীমিত ক্ষমতা দিয়ে এই লড়াই চালানোর চেষ্টা করে গেছি। আমি একজন রাজনৈতিক মনের মানুষ, কিন্তু আমি রাজনীতিবিদ নই। যার জন্য পুরো কাজই আমার জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল এবং নেত্রীর আদেশ আমি পালন করেছি।’
মনোনয়ন চাওয়ার অধিকার সবার আছে উল্লেখ করে পোস্টের শেষে কনকচাঁপা লিখেছেন, ‘দলের যে কারও অধিকার আছে মনোনয়ন চাওয়ার এবং যে কেউ নিজেকে যোগ্য মনে করারও অধিকার রাখে। আবার দলের নীতিনির্ধারকদেরও বিধান আছে যাচাই-বাছাই করে সঠিক মানুষকে বেছে নেওয়ার। অতএব, মনোনয়ন ফরম কেনার দুয়ার সবার জন্য খোলা বলাই বাহুল্য। যাই হোক, আমার সঙ্গে করা অনেক অন্যায়ের বিচারের ভার আমি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিলাম। কিন্তু এর ফলে দলের যদি কোনো ইমেজ ক্ষুণ্ণ হয় তা খুবই দুঃখজনক।’






