গতকাল শনিবার আশা ভোসলের অসুস্থতার খবর শুনে বাংলাদেশের প্রখ্যাত গায়িকা রুনা লায়লার মন খারাপ হয়ে যায়। সেদিন রাতে তিনি আশা ভোসলের ভাইয়ের ছেলে বৈদ্যনাথ মঙ্গেশকরের সঙ্গে কথা বলে তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন। বৈদ্যনাথ জানান, আশা ভোসলের অবস্থা খুব ভালো নয়। এই খবরে রুনা লায়লার মন আরও খারাপ হয়।

আজ রোববার দুপুরে মুক্তকণ্ঠের পক্ষ থেকে রুনা লায়লার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। আশা ভোসলের মৃত্যুর সংবাদ শুনে তিনি কোনোমতে স্বাভাবিক হতে পারছিলেন না। মনে হচ্ছিল যেন কোনো আপনজনকে হারিয়েছেন। কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘উফ্‌ আল্লাহ—এ আমি কী শুনলাম!’

আশা ভোসল ও রুনা লায়লার সম্পর্ক অনেক পুরোনো, যদিও শুরুতে তা ছিল পেশাগত সৌজন্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ২০১২ সালে দুবাইয়ে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিযোগীদের নিয়ে আয়োজিত রিয়েলিটি শো ‘সুরক্ষেত্র’-এ তারা বিচারক ছিলেন রুনা লায়লা, আশা ভোসলে ও আবিদা পারভীন। এই অনুষ্ঠান তাঁদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। এরপর নিয়মিত ফোনে কথা হতো, দেখাসাক্ষাৎও হতো। রুনা বলেন, ‘আমার সঙ্গে আশাজির কথা হয় বেশ কিছুদিন আগে। মাঝে বেশ কিছুদিন ভেবেছিলাম, ফোন করব। করব করব করে আর করা হয়নি। কথাও হলো না। আজ মনে হচ্ছে, কেন করলাম না। করলে তো আরও কিছু গল্প হতো।’ এসব বলতে বলতে কাঁদছিলেন তিনি।

রুনা লায়লা বলেন, ‘সুরক্ষেত্রের বিচারকাজের পর অনেক ঘনিষ্ঠ হয়ে গেছিলাম। দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে যায়। শুটিং সেটে আমরা কত আড্ডা দিয়েছি, হাসাহাসি করেছি। গল্প করতাম। কত রকমের যে কথাবার্তা বলতাম—সব মনে পড়ছে। এই অনুষ্ঠানের পর তিনি ফোন করতেন, আমি করতাম। আমার সুরে গান গাওয়ালাম। আমরা গেলাম, তিনি আমার যাওয়ার খবরে কাবাব বানিয়ে রেখেছিলেন। তিনি খুব ভালো রান্না করতেন। তাঁর নামে তো অনেক রেস্টুরেন্টও ছিল। মৃত্যুর খবরে সব মনে পড়ছে। মনটা খুবই খারাপ।’

৯২ বছর বয়সে মারা গেছেন আশা ভোসলে। রুনা লায়লা বলেন, শিল্পী আশা ভোসলের এই চলে যাওয়া বিশ্বসংগীতের জন্য বিশাল ক্ষতি। এ ধরনের মেধার শূন্যস্থান কখনো পূরণ হবে না। তিনি বলেন, ‘এ রকম প্রতিভা মনে হয় না আর জন্মাবে। শিল্পী ও মানুষ—দুইভাবে তাঁকে আমি পেয়েছি। এত অসাধারণ একজন মানুষ। আমাকে কেন জানি না, খুব মায়া করতেন। তিনি যাঁর সঙ্গে মিশতেন, মন খুলে মিশতেন। মুখে একটা মনে একটা—এমনটা কখনোই করতেন না। আমার সঙ্গে যে সম্পর্কটা ছিল, সেটাও অবিশ্বাস্য।’

কথা প্রসঙ্গে রুনা লায়লা বলেন, ‘তিনি যে মাপের শিল্পী, যে উচ্চতার—নিয়ে বলার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই। আমি ছোটবেলায় ওনার কঠিন কঠিন সব গান শুনে শুনে প্র্যাকটিস করতাম। অভিব্যক্তি অনুসরণ করতাম। কত কিছু শিখেছি তাঁর কাছ থেকে, বলে শেষ করা যাবে না। আমি এসব কথা তাঁকেও বলেছি। তিনি উল্টো আমাকে বলতেন, “আপনার গলায় যে কাজ আছে, তা আমাদের দিতে গেলে অনেক চিন্তা করতে হতো।” আমি শোনার পর বলেছি, কী যে বলেন এসব! আপনার গান গেয়ে গেয়েই তো আমি গলা তৈরি করেছি।’

বয়সে বড় হলেও আশা ভোসলে সম্মান করতেন রুনা লায়লাকে, যা নিয়ে রুনা বেশ অস্বস্তিতে পড়তেন। বারবার অনুরোধ করতেন নাম ধরে ডাকতে। রুনা বলেন, ‘আমাকে তিনি আপনি আর রুনাজি বলে সম্বোধন করতেন। সব সময় বলতাম, আপনি আমাকে নাম ধরে ডাকেন, তুমি করে বলেন। কিন্তু তা তিনি কখনোই করেননি। উল্টো বলতেন, “না না, আপনি অনেক বড় একজন আর্টিস্ট।” আসলে তিনি তাঁর কথাতে বুঝিয়ে দিতেন, কত বড় মাপের শিল্পী ও মানুষ তিনি। এই যে তাঁর কথা বলছি, আমার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। সৃষ্টিকর্তা তাঁকে ভালো রাখুন।’